শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষকের মর্যাদা

শিক্ষা নিয়ে একটা গল্প পড়ে নিই। ছোট্ট এক ছেলে ছিলো প্রচন্ড রাগী। তাই দেখে বাবা তাকে একটা পেরেক ভর্তি ব্যাগ দিল এবং বললো যে, যতোবার তুমি রেগে যাবে ততোবার একটা করে পেরেক আমাদের বাগানের কাঠের বেড়াতে লাগিয়ে আসবে। প্রথম দিনেই ছেলেটিকে বাগানে গিয়ে ৩৭ টি পেরেক মারতে হলো। পরের কয়েক সপ্তাহে ছেলেটি তার রাগকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। তাই প্রতিদিন কাঠে নতুন পেরেকের সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমে এলো। সে বুঝতে পারলো হাতুড়ী দিয়ে কাঠ বেড়ায় পেরেক বসানোর চেয়ে তার রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি সহজ। শেষ পর্যন্ত সেই দিনটি এলো, যেদিন তাকে একটি পেরেকও মারতে হলো না। সে তার বাবাকে এই কথা জানালো।
তারা বাবা তাকে বললো, “এখন তুমি যেসব দিনে তোমার রাগকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সেসব দিনে একটি একটি করে পেরেক খুলে ফেলো”। অনেকদিন চলে গেলো এবং ছেলেটি একদিন তার বাবাকে জানালো যে, সব পেরেকই সে খুলে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। তার বাবা এবার তাকে নিয়ে বাগানে গেল এবং কাঠের বেড়াটি দেখিয়ে বললো, “তুমি খুব ভাল ভাবে তোমার কাজ সম্পন্ন করেছো,এখন তুমি তোমার রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারো কিন্তু দেখো, প্রতিটা কাঠে পেরেকের গর্তগুলো এখনো রয়ে গিয়েছে। কাঠের বেড়াটি কখনো আগের অবস্থায় ফিরে যাবেনা। যখন তুমি কাউকে রেগে গিয়ে কিছু বলো, তখন তার মনে ঠিক এমন একটা আঁচড় পরে যায়। তাই নিজের রাগতে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখো। মানসিক ক্ষত অনেক সময় শারীরিক ক্ষতের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর।”
এই ছোট্ট একটা গল্পে রয়েছে শিক্ষা। আসলে শিক্ষা কী? এই শিক্ষা শব্দটির উৎপত্তি মূলত সংস্কৃত শব্দ “শাস” ধাতু থেকে, যার অর্থ খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে কাউকে ভুল কাজে শাসন করা, কাউকে সঠিক পথে পরিচালিত করা, সৎ কাজে সৎ পরামর্শ দেয়া। যদিও আধুনিক অর্থে শিক্ষা শব্দের অর্থ বিদ্যাচর্চা করা, জ্ঞানার্জন করা, নতুন কিছু অধিগত করা। আসলে কী তাই? শিক্ষার সংজ্ঞা বর্তমানে কী তাই দাঁড়ায়? নৈতিকতা, মুল্যবোধ, মানবিক চর্চা ইত্যাদি কী আমাদের এই সবুজ শ্যামলে ঘেরা বাংলাদেশে আছে? নেই, একদমই নেই। যেখানে শিক্ষা মানে একটা ঘুমন্ত দেশকে প্রবৃদ্ধি দান করা, উন্নত করা, বিশ্বের দরবারে উজ্জীবিত করা, অন্তর্নিহিত শক্তি তথা সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করা – সেখানে আমাদের বর্তমানে শিক্ষার অর্থ হলো উপার্জন করা, একটা চাকরি যোগাড় করা, একটা সুন্দর দেশকে হাজার হাজার সাম্প্রদায়িক খণ্ডে বিভক্ত করা। আহা! কোথায় গেলো সেই শিক্ষা, যার মূল উদ্দেশ্যগুলো একেবারেই হারিয়ে গেছে? বর্তমানে এতোসবকিছুর কারণে শিক্ষার স্তর তিনটি। সুশিক্ষা, স্বশিক্ষা আর কুশিক্ষা। আমরা যদি সুশিক্ষাগ্রহণে অকৃপণ হতাম, গোটা জাতির অন্ধকার নিমিষেই দূর হয়ে যেতো।
শিক্ষক শব্দের আভিধানিক অর্থ শিক্ষাদাতা, উপদেষ্টা, গুরু, শাসনকর্তা, উৎকৃষ্ট চিন্তাশীল সম্মানিত ব্যাক্তি। আজকালের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষকের মানে সামান্য কিছু বেতন বৃদ্ধির জন্য রাস্তায় রাস্তায় আন্দোলন করা, পুলিশের লাঠির আঘাতে মার খেয়ে রক্তাক্ত হওয়া, শিক্ষার্থীকে সুশিক্ষাদানের লক্ষ্যে শসন করায় অভিভাবকের অপমানিত কয়েকটা শব্দ। এটাই বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষকের স্বরূপ। আগেকার যুগে শিক্ষকের কী পরিমাণ মর্যাদা ছিল, কোন পরিবারের মানুষ শিক্ষকতা পেশায় আসতো, তা এখন আর কারও অজানা নেই। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মনে স্বপ্ন এঁকে দেন, জ্বালিয়ে দেন এক অসীম সুদূরপ্রসারী আলোকবর্তিকা। আজকাল আর গুণ্ডাপাণ্ডা লাগেনা, শিক্ষার্থীরাই শিক্ষকদের সম্মান মাটিতে মিটিয়ে দেয় নিমিষেই। যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেত নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো, তখনই আসলে আদবের লাঠি হাত থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছিলো।
একজন শিক্ষক সুমধুর ব্যক্তিত্বের অধিকারী, শিক্ষক হয় সজীব মানসিকতার, উদ্দীপনা সঞ্চয়কারী, নমনীয়তা, কোমলতা। এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা এই টাকার সভ্যতায়ও বিভিন্ন পরীক্ষায় বেতন, ফিস আর ফরম ফিলাপ করতে পারেনা। তারা কী পরীক্ষা দেয় না? দেয়, ভালো রেজাল্টও করে কিন্তু এর পেছনে থাকে একজন সৎ মনমানসিকতাসম্পন্ন, মানুষ গড়ার কারিগর-শিক্ষক। একজন শিক্ষক কোনো লাজুক,দুর্বল কিংবা অসহায় শিক্ষার্থীর পিঠে কোমল হাতটা রাখে,মুহূর্তেই সেই শিক্ষার্থীর ভেতরে একটা প্রদ্বীপ জ্বলে উঠে, স্বপ্নপ্রদ্বীপ।
আমাদের এই বাংলাদেশে আমরা শিক্ষকদের কীভাবে মুল্যায়ন করছি? আজও যদি একজন শিক্ষককে অর্থনৈতিক দৈন্যতায় কাটাতে হয়, এই লজ্জা লুকিয়ে রাখার মতো কোনো জায়গা কী আমাদের আছে? নেই। তাঁরা মাস শেষে বেতন ফুরিয়ে গেলেও কারও কাছে হাত পাততে পারেন না। সারা বিশ্বে আমাদের দেশের চেয়েও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো অত্যন্ত সম্মানজনক। কিন্তু আমাদের দেশে দিন দিন শিক্ষকের মর্যাদা কমছে বৈ বাড়ছে না। আমাদের দেশে অনেক সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী রয়েছেন, যাদের চা – সিগারেটের টাকার খরচের চেয়েও একজন শিক্ষকের বেতন কম। অথচ আজ এই শিক্ষক জাতি আজ মাথা নিচু করে তাদের সন্তানদেরই মানুষ করে তুলবার চেষ্টাটা করে যাচ্ছেন। সত্যিই লজ্জিত প্রিয় শিক্ষক জাতি। এই দেশমাতৃকা লজ্জিত। আমাদের দেশ ও দেশের প্রাজ্ঞ মানুষরা আপনাদের ক্ষমার অযোগ্য।
কামরুজ্জামান বাবু সাংবাদিক ও নাট্যকার ০১৯১১৩৬৭৭৬৬
