শরীফুল ইসলামের ধারাবাহিক উপন্যাস – আলো আঁধারীর খেলা

ধারাবাহিক উপন্যাস – আলো আঁধারীর খেলা (পর্ব - তিন)
– সিগারেট দে। গোল্ডলিফ দে।
বলেই জাফর আবার এক পায়ে ভর দিয়ে নাচতে শুরু করে দিল। জাফরের কষ্ট দেখে সবাই ছটফট করছে। জাফরের ছোটো একমাত্র ছেলে সন্তানটি পাশেই বাবার এমন কষ্ট দেখছে। তবে কষ্ট বুঝে উঠার বয়স এখনো তার হয়নি। শুধু বাবা কাদে তাই সেও কাঁদে। ও হে সিগারেটের বিষয়টা খোলাসা করে দেই। দরিদ্র লিটন যাকে আমরা শঙ্কর পন্ডিত নামে জানতাম আজ জানলাম সে শঙ্কর না, বাড়ির কোনো এক ওঝা পন্ডিত। জ্বিনের আভাস পেলেও নামটা ভুল জেনেছিল। সে যাই হোক এই দরিদ্র লিটন পন্ডিত জ্বিন আবার সিগারেটও খায়। তাও আবার সব সিগারেট না। গোল্ডলিফ। যতক্ষণ তাকে সিগারেট দেয়া যায় ততক্ষণ জাফরের উপর তার প্রহার থেমে থাকে। তা না হলেই বাড়ে অত্যাচার।
এদিকে সেই রাম ঘরের ওঝা তার সকল মন্ত্রভান্ডার শেষ করলেও দরিদ্র লিটনকে থামানো বা ছাড়ানোর মন্ত্র তার ঝুলিতে নাই, তা উপস্থিত সবাই বুঝতে পারলেও সে তার মন্ত্র আওড়াচ্ছে বারবার। হঠাৎ জাফরের হাতের সিগারেট শেষ হয়ে গেলে জাফর আবার চিৎকার করে এক পায়ে ভর দিয়ে নাচতে থাকে আর সেই আগের মতো “মা গো, বাঁচাও ! মাইরা ফালাইলো গো ! ” বলতে বলতে চোখগুলো রক্তের ন্যায় লাল করে মুহূর্তে ছুটে এসে রামঘরের উঝার উপর চড়ে বসে বেধরক মার শুরু করে দেয়।
ওঝার এখন এমন অবস্থা যে, কোনোভাবে প্রাণ নিয়ে ফরতে পারলেই বাঁচে। এমন দৃশ্য পুরো পরিস্থিতিটাকে যেনো একটি সার্কাসের জোকারদের অভিনয়দৃশ্যের রূপ দিয়েছে। এদিকে রাহাদের আম্মা পাড়ার মুরব্বি মহিলা। বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তোলে। কারণ এতোকিছু ঘটে যাচ্ছে কিন্তু জাফরের তো কষ্টের কোনো লাঘব হলো না। সেদিকে কারও নজরও নেই। এদিকে ওঝা কোনোভাবে প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে। বুঝাই যাচ্ছে এই চেষ্টায় আর কোনো ফায়দা নেই। হঠাত রাহাদের মা জাফরের একমাত্র ছেলেটিকে জাফরের পায়ের কাছে নিয়ে ঠেলে দিয়ে বলে,
– হুজুর, মারতেই যখন হবে তাহলে আর জাফর কেন তার এই একমাত্র সন্তানকেও মেরে ফেলেন।
জাফর তার নাচ থামিয়ে থমকে গিয়ে তাকিয়ে থাকে। রাহাদের মায়ের দু’গাল বেয়ে তখন অশ্রু ঝরছে। জাফরের মুখ দিয়ে দরিদ্র লিটন এর কোমল স্বর ভেসে আসলো।
– এই শিশুতো নিষ্পাপ তাকে এখানে কেনো আনলি।
রাহাদের মা উত্তরে বলল,
– দেখের হুজুর জাফর মরে গেলে তার পরিবারের থেকে যাবে তার বউ আর এই মাসুম বাচ্চাটা। তার বউ না হয় কদিন পর আরেকটা বিয়ে করে সংসারী হয়ে যাবে কিন্তু এই খোকার কি হবে? না পাবে বাবা, না পাবে মায়ের আদর। দিনশেষে সে হয়ে যাবে সবচেয়ে অবহেলিত। তাই তাকেও আপনি নিয়ে যান। না হয় তার দিকে চেয়ে জাফরকে আপনি ফিরিয়ে দিন।
(চলবে)
