শরীফুল ইসলামের ধারাবাহিক উপন্যাস – আলো আঁধারীর খেলা

আলো আঁধারীর খেলা – শরীফুল ইসলাম
পর্ব – এক.
এক অদ্ভুত গ্রামের অদ্ভুত এক বাড়ি। বলে রাখা জরুরি, এখানে বাড়ি বলতে কিন্তু একটি বাড়িকে বুঝানো হচ্ছে না । কয়েকটি পরিবার মিলে একটি বাড়ির মতো কিন্তু একটি বাড়ি নয়, একটি সমাজ বলা যেতে পারে। তবে এটি এমন এক সমাজ, যার প্রতিটি পরিবার তার আলাদা ক্ষমতা নিয়ে নিজস্ব গতিতে জীবন যাপন করে। এখানেও মনে রাখার বিষয় হলো, ক্ষমতা আর ক্ষমতা বলতে রাজনৈতিক বা সামাজিক মোড়ল জাতীয় ক্ষমতা নয়-এটি অলৌকিক ক্ষমতা। গুলিয়ে ফেলছেন নিশ্চয়ই।
সমস্যা নেই, সহজ করে দিচ্ছি । এখানকার বেশীরভাগ পরিবারই জ্বীনদের সাথে কাজকর্ম করে থাকে। প্রায় প্রতিটি ঘরেই জ্বীনদের প্রভাব লক্ষণীয়। যে কেউ জ্বীনের সাহায্যে যে কারও ক্ষতি করতে পারে। কেউ হারানো জিনিস ফিরিয়ে দিচ্ছে, কেউ কুকুরে কামড় দেওয়া রোগির চিকিৎসা দিতে পারে আবার কেউ জ্বীনের প্রহসনের শিকার। কেউ কেউ জাদুটোনা বা তাবিজ দিচ্ছে, কেউ বা ঝাড়ফুঁক দিচ্ছে। এভাবে প্রতিটি পরিবারই কোনো না কোনোভাবে এ পেশায় জড়িত কিংবা বা জাদুটোনার কবলে নাজেহাল। এ বাড়ির একটা নাম দেয়া যাক। সমাজবাড়ি। এই সমাজবাড়ির প্রতিটা চরিত্রই নাটকীয়তায় ভরা। হাস্যরসাত্তক চরিত্রের মাঝেই খুঁজে পাওয়া যায় পারিবারিক কলহ কিংবা বন্ধুত্ব। এখানে প্রতিটা পরিবারই একেক রকমের চরিত্র নিয়ে বসবাস করে আর একেকটা চরিত্রই একেকটা ঘটনার উৎস।
তিনি জাফর পাগলা। এক সময় গ্রামের প্রথম প্রবাসী, প্রথম ধনী ব্যক্তি। দীর্ঘ সময় কুয়েত থেকে বেশ টাকা পয়সার মালিক হন । প্রচন্ড মাতৃভক্ত। মা বলতে দিশেহারা। আরেকটি গুণ না বললেই নয়, সেটা তার গানের গলা। এক অসাধারণ মায়াবী কন্ঠের অধিকারী। জাফর পাগলা গান ধরা মানে উঠোনে মানুষের ভীড় আর প্রতিটি ঘরের জানালার পাট খুলে উপভোগ করার এক অসাধারণ চিত্র দেখা যায়। এই গান তার এক সময় গলার কাটা হয়ে উঠে।
একদিন সন্ধ্যাবেলা বাড়ি থেকে একটু দূরেই একপাশে কবরস্থান অন্যপাশে হিন্দুদের চিতা। মাঝখান দিয়ে মেঠোপথ। এই পথ দিয়ে আপন মনে গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে হেঁটে চলছে জাফর। এই গান আর আবেগঘন সুর হৃদয়ে দাগ কাটে শঙ্কর ঠাকুরের। শঙ্কর ঠাকুর। জ্বীনদের এক বিজ্ঞ পন্ডিত। সকল ধর্মের সকল শাস্ত্রে যার গভীর জ্ঞান। জাফরের গান ভালো লাগলে তিনি নিজে এসে জাফরের সাথে কথা বলেন। তিনি বলেন,
- জাফর তুমি একজন ভালো মানুষ। তোমাকে আমি একটি বর দিচ্ছি । তুমি এখন থেকে এই ক্ষমতা লাভ করবে যে, মানুষের আকাঙ্খা তোমাকে ব্যক্ত করলে তুমি সমাধান বলে দিবে। তুমি যা বলবে তাই হবে। তবে শর্ত হলো, এই কথা তুমি ছাড়া কেউ যেন না জানে। যদি কেউ জানে তাহলে আমি তোমার সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াবো।
জাফর ভয়ে সেদিন কারও সাথে কোনো কথা বলেনি। এদিকে ব্যবসা – বাণিজ্যের পসার তার হচ্ছেই। এই গ্রামের প্রথম দালান তুলে জাফর। তখনকার সময় আলোচিত যান বেবী টেক্সি। এমন কয়েকটি বেবি টেক্সির মালিক তিনি। সবকিছু ঠিকঠাকই এগুচ্ছে কিন্তু হঠাৎ একদিন বিশ্বাস করে পাশের বাড়ির ভাবিকে এই গোপন কথা বলে দেয়। ব্যস ! সেদিন থেকে নেমে আসে অমানিশার দূর্ভোগ। জাফর হয়ে উঠে পাগল। শরীর থেকে সমস্ত বস্ত্র খুলে উলঙ্গ হয়ে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে জাফর। স্ত্রী -পুত্র গ্রামবাসী এই চিত্র স্বচক্ষে দেখে।
প্রথমে সবাই এটাকে অতি পাগলামি ভেবে তার প্রতি ক্ষুব্ধ হলেও পরক্ষণেই তারা দেখতে পায়, গাছের উঁচু ডালে উঠে গেছে জাফর। সেখানেও এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। পায়ের গোড়ালি ফেটে রক্তে লাল হয়ে যায়। জাফরের কোনো শব্দ নেই, যা আছে সেটা শুধু দাঁড়িয়ে থাকা। এবার সবারই বুঝতে বাকি রইলো না যে, এটা জ্বীনের আছড়। একে একে জাফরকে সুস্থ করতে তার সমস্ত সম্পদ বিলীন হয়ে গেলো চোখের পলকে। কতো কবিরাজ, সাধু, তান্ত্রিক, গণক আনা হলো! একে একে সবাই ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল।
(চলবে)
