গল্প: পুনর্জন্ম

পুনর্জন্ম
আসাদুল্লাহ রাকিব
আমি বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে আমার পুনর্জন্ম। এর আগে ১৭৫৭ সালে আমি প্রথমবার মৃত্যুবরণ করি। তোমরা জানলে অবাক হবে, আমার প্রথম মৃত্যুর আগে আমি পুরোপুরি সুস্থ ছিলাম। শান, মর্যাদা আর জৌলুসে আমি ছিলাম অদ্বিতীয়। মৌর্য, গুপ্ত, গৌড়, পাল, সেন, সুলতানি আর মুঘল শাসনামলে আমি ছিলাম শাসকের অকৃত্রিম প্রেম। ঐতিহাসিক ভারতবর্ষে আমার বসবাস ছিলো পরাক্রমশালী নবাব আর সুবাদার’দের হৃদয়ে। আমাকে তাঁরা ভালোবাসতো, নিজের মায়ের মতো, নিজের মেয়ের মতো। মারাঠার বর্গী’রা যখন আমার দেহের উপর তাদের বিষাক্ত নিঃশ্বাস নিক্ষেপ করেছিলো, তখন আমার সন্তান’রা আমাকে রক্ষা করেছে রক্ত আর জীবনের বিনিময়ে। আমিও তাদের গভীরভাবে ভালোবাসতাম। ফল আর ফসলে ভরিয়ে দিতাম আমার সমগ্র পেট। ভালোবাসা পেলে কে তার বিনিময় না দেয় বলো?
কিন্তু জানো, ধীরে ধীরে আমার কেমন যেন অসুখ হতে লাগলো। কে যেন কে এলো, মাথায় বিদেশি ক্যাপ আর পায়ে বুট পরে আমার বুকে হাটতে লাগলো। আমি তো খুন্তি কোদালের ভার সইতে পারতাম। চাষের জলে তো আমি কখনোই ডুবতামনা। কিন্তু এদের এই শক্ত বুটের আঘাতে আমি আহত হয়ে যাই। আমার তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলা তখন এদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ায়। আমাকে ভালোবেসে, আমাকে রক্ষা করার জন্য আমার হৃদয়ের নবাব গর্জে উঠে। আমার এ অচেনা অসুখ বৃদ্ধি না করে আমাকে আমার প্রথম মরণ থেকে বাঁচাবার জন্য তিনি কোনো আপোষ করেননি। পরিষদ, যোদ্ধা আর জনগনকে নিয়ে নবাবের ইচ্ছা ছিলো একটাই। আমাকে সারিয়ে তুলা, আমাকে বাঁচানো।
কিন্তু আমি বাঁচিনি।বিশ্বাসঘাতকতা নামক তীব্র অসুখে আমি মরে গেলাম। পলাশিতে, প্রথমবার।
তারপর কতোশতো দিন চলে গেলো। আমার মরা দেহের উপর কতো অত্যাচার, নির্যাতন, লাঞ্চনা বয়ে গেলো তোমরা তো জানোই। আমাকে ভালোবেসে আমার মরদেহের উপর জ্বলেপুরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া সেনাপতি মীর মদন আর মোহনলাল আর কোনোদিন জন্মায়নি বলে আমি কতো দাসত্ব আর পরাধীনতা সহ্য করেছি যুগের পর যুগ তোমরা কি তা জানো?
এ ব্যথা শুধু আমার, আমি একাই জানি তা।
তারপর ফকির-সন্ন্যাসী, চাকমা, সাঁওতাল, সিপাহী, বারাসাত আর নীল বিদ্রোহ নামে কতোকিছু হয়ে গেলো। আমার গায়ের উপর তৈরী হলো শক্ত প্রাচীর, তোমরা যাকে বাঁশের কেল্লা বলো। ফরায়েজী আন্দোলন হলো চল্লিশ বছর। আমার বিষন্ন বধির পরাধীনতা তাতে এক ফুটাও কমেনি।
আমার পঁচা গলা দেহের উপর যখন মজনু শাহ, ভবানী পাঠক, জোয়ান বকস, বিশ্বনাথ, সিধু-কানু, মঙ্গলপান্ডে, হাজী শরীয়ত আর তিতুমীর’রা এসে আমাকে দ্বিতীয় জন্মের অসহ্য আশ্বাস দিতে লাগলো, তখন’ই আমার ভেতর বেঁচে থাকা সুপ্ত ছোঁয়াচে অসুখটা কিভাবে কিভাবে যেন তাঁদেরও ধ্বংস করে দিতো আমার মতোই।
বাঁশের কেল্লায় আমার কবর হয়, নীলের জমিতে আমার কবর হয়।
আহ! সে কি গভীর প্রহসন, উন্মোক্ত তামাশা।
তোমরা তা দেখোনি, হয়তোবা জানোইনা।

কতো নতুন নতুন রোগ, রঙ বেরঙের অসুখ আমার হৃদপিন্ডে জমা হতো তা শুধু আমিই জানি। বুট পরা পুরনো ইংরেজ, রক্ত খাওয়া জমিদার, অত্যাচারী নীলকর, আরো কতো ভুলে যাওয়া অসুখের নাম!
তোমরা কি তা শুনেছো? শুনেছো নিশ্চয়।
তারপর আরো বহু বহু কাল কেটে গেলো দাসত্বে। আমি দ্বিখন্ডিত হলাম বঙ্গভঙ্গে। আঠারো বছরের ছেলে ক্ষুদিরাম মারা যায়, প্রফুল্ল চাকি সুইসাইড করে। মাস্টার দা সূর্যসেনের ফাঁসি হয়। কল্পনা দত্ত ধরা পরে, পটাশিয়াম সায়ানাইড খায় প্রীতিলতা ওয়েদ্দেদার।
আমার দেহের মরণব্যাধীতে তাঁরাও আমার মতো মরে যায় অসহ্য অনিচ্ছায়। স্বদেশ যাদের মরে গেছে দেড়শো বছর আগে, তবুও কেন তাঁরা স্বদেশী আন্দোলনে নিজেদের বিলিয়ে দিলো তার কারণ কি তোমরা জানো?
তোমরা জানোনা। আমি জানি এ ভালোবাসার মানে।
আমি যখন ফিরে আসার সব আশা ছেড়ে দিলাম, তখন’ই নাথান কমিশন আর স্যাডলার কমিশনের মাধ্যমে আমি পেলাম এক অনিন্দ্য সুন্দর উপহার, ঐতিহ্যের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়!
পলাশীর আমবাগানে প্রথম সমাধীর পর, পরাধীনতা আর দাসত্বের দেড়শো বছরে নবাব সলিমুল্লাহর জমিতে এই যেন আমি মাথা তুললাম প্রথমবার। এগুলো তো তোমরা জানোই।
কিন্তু জানোনা, বিকৃত কাফন ভেদ করে একটুখানি বের হবার জন্যও আমি মুখোমুখি হয়েছি কতো হায়েনার। তাদের নাম আমি বলতে চাইনা। কারণ তারা আমার শুভাকাঙ্খী নয়।
লর্ড হার্ডিঞ্জ, রবার্ট নাথান, মাইকেল স্যাডলার, নওয়াব আলী আর নবাব সলিমুল্লাহ’রা সেবার আমার চোখ ভিজতে দেয়নি।
তারপর কেটে গেলো আরো কতোশতো যাযাবর দিন। আমার দুঃখ কান্নার আর্তনাদে বিদ্রোহী হলো কাজী নজরুল। শেরে বাংলা, সহোরাওয়ার্দী আর ভাসানী’রা আমাকে আঁকড়ে ধরলো ভালোবেসে। মিশন স্কুলে আবিষ্কার হলো শেখ মুজিব। জন্ম নিলো জিয়া। আমি যেন মুক্তির এক পশলা বৃষ্টিতে ভিজে গেলাম।
দাসত্বের নদীগুলো শুকিয়ে চৌচির হলো। দুর্ভিক্ষ হলো আমার নরম হৃদপিন্ডে। ত্রিশ লক্ষ সন্তানের প্রাণের বিনিময়ে আমি পেলাম ম্যাডোনা ৪৩, নেমেসিস আর অশনি সংকেতের মতো ভয়াবহ ইতিহাস।
আমার এ বেদনা অনুভব করার ক্ষমতা তোমাদের নেই।
তারপর ভারতবর্ষ স্বাধীন হলো। পাকিস্তানের জন্ম হলো। শুধু আমি একা মুক্ত হতে পারিনি কোনোভাবে। এতো সংগ্রাম, যুদ্ধ, বিদ্রোহের পর আমার প্রাপ্তি কতো সাধারণ তোমরা কি তা জানো?
আমার শরীর থেকে সেদিন শুধু বুট পরা ইংরেজের পায়ের আঘাতটুকুই সরেছিলো। আর কিছুই আমি পেলাম না। শুনলে তোমরা হাসবে, সেদিন আমার নাম হয়েছিলো পাকিস্তান। হৃদয়ের মৌনতা ভেঙে অনন্তকাল ধরে আমার ভেতরে বেঁচে থাকা পুন্ড্র, বঙ্গ, বরেন্দ্র, সমতট আর হরিকেল জনপদগুলো সেদিন হেসেছিলো নিশ্চয়।
তারপর আরো কতো অপরিচিত দিন এলো আমার আঙিনায়। ভাষার জন্য সংগ্রাম হলো, তমুদ্দিন মজলিস গঠিত হলো। সালাম, রফিক, বরকত’রা মারা গেলো মিছিলে। প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে নির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় ছিলো মাত্র ৫৬ দিন। এতো দুঃসহ যন্ত্রণা আমি তোমাদের বলতে পারবোনা। সামরিক শাসন, ছয় দফা, গণঅভ্যুথান, সাধারণ নির্বাচন এসব রেখে চলো তোমাদের রেসকোর্স, কালো রাত আর মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি।
না থাক…….
এসব তোমরা জানো। শুধু জানোনা মনে হয় ২১৪ বছরের দাসত্ব আর পরাধীনতার নোঙর ভেঙে আমার মুক্ত হওয়ার হিসেবটা।
সেদিন আমার পুনর্জন্ম হয়েছিলো।
