,

আশুরার পটভূমি: করণীয় ও বর্জনীয় কাজ সমূহ

আশুরার পটভূমি: করণীয় ও বর্জনীয় কাজ সমূহ

মো. স্বপন হোসেন,

কামিল মাস্টার্স, আল কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অধ্যয়নরত, মঙ্গলবাড়ীয়া কামিল মাদরাসা, পাকুন্দিয়া, কিশোরগঞ্জ।

আরবি ১২ মাসের মধ্যে প্রথম মাসটির নাম মহররম (সম্মানিত)। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস ১২টি, আসমান ও জমিন সৃষ্টি দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি (জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব) সম্মানিত মাস। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। (সূরা তাওবা: ৩৬)

অর্থাৎ সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই বছরে আরবি ১২ মাস ধার্য হয়েছে, যা লওহে মাহফুজে লেখা রয়েছে। তার বাস্তবায়ন আকাশ-জমিন সৃষ্টির দিন থেকে হয়েছে। তবে জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব সম্মানিত এবং রবকতপূর্ণ মাস।

ইমাম জাসসাস (র.) ‘আহকামুল কোরআন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, পবিত্র কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী সম্মানিত চার মাসের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্যান্য মাসে নেই। এ মাসে বেশি বেশি ইবাদত বন্দেগি করলে অন্য মাসগুলোতেও ইবাদত বন্দেগির তাওফিক ও সাহস লাভ করা যায়। এ মাসগুলোর মধ্যে পাপ কাজ থেকে বিরত থাকলে অন্যান্য মাসেও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার আদত গড়ে উঠে। এমনকি মহররম মাসের দশ তারিখ, যাকে আমরা আশুরার দিন হিসেবে জানি। বড় বড় ঐতিহাসিক ঘটনাবলি সৃষ্টির কারণে দিনটি মানুষের মাঝে চিরস্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছে। আল্লামা ইবনে নাবাতা (র.) তার খুতবাতে উল্লেখ করেন, এদিনে আল্লাহতায়ালা হজরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল করেন। এ দিনেই হজরত নূহ (আ.) ও তার সঙ্গীরা মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি পেয়ে জুদি পাহাড়ে অবতরণ করেন, হজরত ইব্রাহিম (আ.) জালেম নমরুদের আগুন থেকে, হজরত মূসা (আ.) ও বনী ইসরাইলরা ফেরাউন এবং তার বাহিনী থেকে নাজাত লাভ করেন। হজরত ঈসা (আ.)-কে আল্লাহতায়ালা এ দিনেই তার কাছে উঠিয়ে নেন। এ ধরনের বহু বড় বড় ঘটনাবলির কারণে দিনটির সম্মান ও মর্যাদা সুস্পষ্ট। ঘটনাক্রমে এ দিনেই কারবালার প্রান্তরে রসুল (সা.)-এর আদরের নাতি, কলিজার টুকরা, নয়নের মণি ইমাম হোসাইন (রা.) নির্মমভাবে শাহাদাতবরণ করেন। যা অত্যন্ত নির্মম, নির্দয় ও দুঃখজনক স্মৃতি। মানব ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়ের সূচনা করেছে। কিন্তু উল্লিখিত আলোচনা থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, এ দিনের সম্মান শুধু কারবালার ঘটনার কারণেই নয়, বরং তার বহু ঐতিহাসিক কারণ, রসুল (সা.)-এর বাণী ও আমল রয়েছে।

ইসলামী সনের নাম হলো হিজরি সন, আর হিজরি সনের প্রথম মাস মুহাররামুল হারাম। এই মাস অনেক ফজিলত ও বরকতের মাস, ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগেও এই মাসকে সম্মানিত মনে করা হতো। এই মাসের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার্থে আরবরাও যুদ্ধবিগ্রহ মওকুফ রাখত।
এ দিনে প্রাচীন আরবরা কাবার দরজা দর্শনার্থীদের জন্য খোলা রাখত। মহররম অর্থ মর্যাদাপূর্ণ, তাৎপর্যপূর্ণ। যেহেতু অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য ও রহস্যময় তাৎপর্য নিহিত রয়েছে এ মাসকে ঘিরে, সঙ্গে সঙ্গে এ মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ছিল, এসব কারণেই এ মাসটি মর্যাদাপূর্ণ। তাই এ মাসের নামকরণ করা হয়েছে মহররম বা মর্যাদাপূর্ণ মাস। এতে বোঝা যায়, এর ইজ্জত, ইহতেরাম, সম্মান ও মর্যাদা বহু আগে থেকেই ছিল। হাদিস শরিফে এসেছে বছর হলো বারো মাসের সমষ্টি, তার মধ্যে চারটি অতি সম্মানিত তিনটি পরপর লাগোয়া জিলকদ, জিলহজ ও মহররম আর চতুর্থটি হলো রজব। (বুখারি: ২৯৫৮)

“মুহাররামুল হারাম” বলা হয়েছে আরবী বছরের বা হিজরী সালের প্রথম মাসকে। অর্থাৎ সম্মানিত মুহাররাম মাস। আল্লাহ যে চারটি মাসকে সম্মানিত করেছেন তার মধ্যে মুহাররাম মাস রয়েছে। আগের উম্মতের জন্য সবচেয়ে সম্মানিত রোজা ছিল এই মাসের রোজা। একে আশুরার রোজা বলে। ফরজ রোজার পরে তাদের নিকট সবচেয়ে দামী ছিলো আশুরার রোজা। আর আমাদের জন্য ফরজ রোজার পরে নফল রোজার মধ্যে সবচেয়ে দামী হলো আরাফার রোজা (যিলহাজ্জ মাসের ৯ম তারিখ)। আশুরার রোজা রাখার কারনে পেছনের যিন্দেগীর এক বছরের গুনাহ মাফ হয়। ইয়াহুদিরা বলে মুসা (আ.) এর যুগ থেকে, আসলে তা না। আর মুসলমান নামধারী শি‘আ যারা সত্যিকার অর্থে কাফের তারা বলে বেড়ায় আশুরা ইমাম হুসাইন (রা.) এর সময় থেকে। এই শি‘আদের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের সমাজের সরলমনা ইলমবিহীন সাধারণ মুসলমান তাই বিশ্বাস করে বসে আছে। তাদের ধারনা এই দিনে ইমাম হুসাইন (রা.) শহীদ হয়েছে, তাই এই দিনের এতো মর্তবা। অথচ আশুরার ফজিলত শুরু হয়েছে আদম (আ.) এর যুগ থেকে। আগেই বলা হয়েছে, আগের উম্মতের জন্য এই দিনে রোজা রাখা নফলের দিক দিয়ে অনেক দামী। এবং আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মাসের মর্তবার ব্যাপারে ইমাম হুসাইন (রা.) এর শহীদ হওয়ার আগেই বলে গেছেন। সুতরাং যদি এভাবে বলা হয় যে এই দিনটি আগে থেকেই দামী আর আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন, শহীদের সর্দার ইমাম হুসাইন (রা.) এর মর্যাদা আরো বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তাঁর শহীদের জন্য এই দিনকে পছন্দ করেছেন। এতে একদিকে যেমন সঠিক কথা বলা হলো এবং অপরদিকে ইমাম হুসাইন (রা.) সম্মানকে মানুষের নজরে আরো উচুঁ করে তুলে ধরা হলো। যেমন: আমাদের সকলেরই মৃত্যু আসবে। আল্লাহ যদি কোন মোমিনের মৃত্যু শুক্রবারে নির্ধারণ করে এর দ্বারা ঐ মোমিনের মর্তবা বাড়বে, শুক্রবারের না। ঠিক তেমনি যদি সোমবারে মৃত্যুবরণ করে তবে আরো দাম বাড়লো। শুক্রবার থেকে সোমবারে মৃত্যু মোমিনের জন্য বেশী বরকতময়।

আশুরার পটভূমি: আশুরা মুহাররম মাসের ১০ তারিখকে বলা হয়। ইসলাম ধর্মে এই দিবসটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এই দিনে ইসলামের অনেক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাবলী সংঘটিত হয়েছে। যেমন: হযরত আবূ হুরাইরা (রাযি.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে যে, (একদা) নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইয়াহুদীদের কতিপয় এমন লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন, যারা আশুরার দিনে রোযা রেখেছিল। নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন “এটা কিসের রোযা?” উত্তরে তারা বলল, “এই দিনে আল্লাহ তা‘আলা হযরত মূসা (আ.) ও বনী ইসরাঈলকে ডুবে যাওয়া থেকে উদ্ধার করেছিলেন। (অন্য বর্ণনায় আছে ফিরআউনের নির্যাতন থেকে মুক্ত করেছিলেন।) এবং ফিরআউনকে দল-বল সহ নিমজ্জিত করেছিলেন। আর এই দিনেই হযরত নূহ (আ.)- এর কিশতী জূদী পর্বতে স্থির হয়েছিল। ফলে এই দিনে হযরত নূহ (আ.) ও হযরত মূসা (আ.) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রোযা রেখেছিলেন। তাই আমরাও এই দিনে রোযা রাখি।” তখন নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “মূসা (আ.)-এর অনুসরণের ব্যাপারে এবং এই দিনে রোযা রাখার ব্যাপারে আমি তোমাদের চেয়ে বেশী হক্বদার।” অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেদিন (আশুরার দিন) রোযা রাখেন এবং সাহাবাদেরকেও রোযা রাখতে আদেশ করেন। (বুখারী: হা. নং- ২০০৪, মুসলিম: হা. নং- ১১৩০, মুসনাদে আহমাদ: হা. নং- ৩৬০)

কারবালার বিরল দৃষ্টান্ত: আল্লাহতায়ালা মহররম মাসের দশ তারিখকে কারবালার ঐতিহাসিক বিরল দৃষ্টান্তের জন্যও মনোনীত করেছেন। এ দিনে নবী দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.) ও তার পরিবারবর্গ যে আত্মত্যাগের মহা বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা অপূর্ব। হিজরি ৬০ সনে ও ইংরেজি ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে এ দিনে ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে স্মরণকালের মানব ইতিহাসের নির্মমতম হৃদয়বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয়। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.) সপরিবারে এদিন ফোরাতের কিনারে শাহাদতের পানি পান করেন। নীতি ও আদর্শের জন্য, সত্য ও ন্যায়ের জন্য অবলীলায় প্রাণ উত্সর্গ মানব ইতিহাসে সত্যিই বিরল। অপ্রতিরোধ্য বাতিল ও শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে তেজদীপ্ত ঈমানদারের দুর্বল প্রতিরোধের যে ইতিহাস আশুরার দিনে কারবালা প্রান্তরে রচিত হয়েছে, তা অনন্য ও কালজয়ী। যুগ যুগ ধরে এ ঘটনা মানুষকে বাতিলের বিরুদ্ধে প্রত্যয়ী হওয়ার প্রেরণা জোগায়।

আশুরার ফযীলত: হযরত আবূ কাতাদাহ (রাযি.) থেকে বর্ণিত যে, নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, “আমি আশাবাদী যে, আশুরার দিনের রোযার উসীলায় আল্লাহ তা‘আলা অতীতের এক বৎসরের গুনাহ মাফ করে দিবেন।” (তিরমিযী: হা. নং- ৭৫১)

হযরত আবূ হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত অপর হাদীসে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, “রমাযানের রোযার পর মুহাররম মাসের রোযা সর্বোত্তম।” (মুসলিম: হাঃ). নং- ১১৬৩)

আশুরায় করণীয় কাজ সমূহ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি নবী করিম (সা.)-কে রোজা রাখার জন্য এত অধিক আগ্রহী হতে দেখেনি, যত আগ্রহী হতে দেখেছি এই আশুরার রোজা ও রমজান মাসের রোজার প্রতি।’ (বুখারি: ৪/২৪৫, ২০০৬, মুসলিম: ১১৩২)।

আশুরার আগে একদিন বা পরে একদিন রোজা রাখো’ (মুসনাদে আহমদ: ১/২৪১)

উল্লিখিত হাদিস ও অন্য হাদিসের আলোকে ফকিহরা বলেন, রোজা দুই দিন রাখা মোস্তাহাব ৯ ও ১০ তারিখ, তা না হলে ১০ ও ১১ তারিখ। কারণ, এ ক্ষেত্রে রাসূল (সা.)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ইহুদিদের বিরুদ্ধাচরণ করা উচিত। তাই ফকিহরা আশুরার দিনেই শুধু একটা রোজা রাখাকে মাকরূহ বলেছেন।

মহররম মাসে রোজা রাখা সম্পর্কে অনেক বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। বিশেষভাবে আশুরা, অর্থাৎ মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখার ফজিলত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। একটি হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর ফরজ ছিল। পরবর্তী সময়ে অবশ্যই ওই বিধান রহিত হয়ে যায় এবং তা নফলে পরিণত হয়। হাদিস শরিফে হজরত জাবের (রা.) সূত্রে বর্ণিত আছে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের আশুরার রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং এর প্রতি উৎসাহিত করতেন। এ বিষয়ে নিয়মিত তিনি আমাদের খবরাখবর নিতেন। যখন রমজানের রোজা ফরজ করা হলো, তখন আশুরার রোজার ব্যাপারে তিনি আমাদের নির্দেশও দিতেন না এবং নিষেধও করতেন না। আর এ বিষয়ে তিনি আমাদের খবরাখবরও নিতেন না। -(সহিহ মুসলিম শরিফ: হা. ১১২৮)

ওই হাদিসের আলোকে আশুরার রোজার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতীয়মান হয়। এমনকি ওই সময়ে তা ফরজ ছিল। বর্তমানে এই রোজা যদিও নফল, কিন্তু অন্যান্য নফল রোজার তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

আশুরার দিনে অন্য একটি আমল, হজরত আবু হুরাইরা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, নবী (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিনে আপন পরিবার-পরিজনের মধ্যে পর্যাপ্ত খানাপিনার ব্যবস্থা করবে, আল্লাহ পাক পুরো বছর তার রিজিকে বরকত দান করবেন (তারাবানি: ৯৩০৩)।

তা’যিয়ার সামনে যে সমস্ত নযর-নিয়ায পেশ করা হয় তা গাইরুল্লাহর নামে উৎসর্গ করা হয় বিধায় তা খাওয়া হারাম। (সূরায়ে মায়েদাহ: ৩)

মর্সিয়া বা শোকগাঁথা পাঠ করা, এর জন্য মজলিস করা এবং তাতে অংশগ্রহণ করা সবই নাজায়িয। (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৫/২৯৪, কিফায়াতুল মুফতী: ৯/৩২, ৪২)

হজরত মুসা (আ.) ও ইবরাহিম (আ.)-এর চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়া: আশুরার দিন হজরত মুসা (আ.)-এর বিজয়ের ইতিহাস স্মরণ করতে হবে। তিনি যেভাবে আল্লাহর পথে অবিচল থেকে ফেরাউনের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন, ঠিক তেমনিভাবে আমাদেরও বাতিলের পথকে রুদ্ধ করে ইসলামের আলোয় আলোকিত সমাজ গঠনের প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহর নবী হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতা গড়তে হবে।

প্রতি বছর এ দিনটি যখনই মানুষের কাছে ধরা দেয়, তখনই মনে হয় যেন আশুরা তার শিক্ষার ভাণ্ডার নিয়ে আমাদের নতুনভাবে ডাকছে। এ দিনের আবেদন ফুরানোর নয়। আর তাই আশুরাকে আমাদের সুন্দরভাবে উদযাপন করতে হবে। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এ দিনকে যেভাবে উদযাপন করেছেন এবং উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছেন, আমাদেরও ঠিক সেভাবেই উদযাপন করতে হবে।

কারবালার শিক্ষা বুকে ধারণ করা: আশুরার দিন কারবালা প্রান্তরে মানবেতিহাসের যে নির্মম কাহিনী রচিত হয়েছিল তা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের মজবুত ঈমান। তাই আমাদের ঈমানি চেতনায় বলীয়ান হয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জীবন পরিচালনা করতে হবে।

কারবালার প্রান্তরে হজরত হুসাইন (রা.) সপরিবারে আত্মত্যাগ করে সমগ্র বিশ্ববাসীকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন, যে মস্তক আল্লাহর কাছে নত হয়েছে সে মস্তক কখনও বাতিল শক্তির কাছে নত হতে পারে না। আল্লাহর পথে অটল থাকতে মুমিনরা তাদের জীবনকে উত্সর্গ করতে দ্বিধা করে না। তাই আজকের মুসলমানরা সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শপথ নিতে পারলেই কেবল আশুরার তাত্পর্য প্রতিফলিত হবে।

অতএব যদি কেউ উপরিউক্ত হাদিসের ওপর আমল করার উদ্দেশ্যে ওই দিন উন্নত খানাপিনার ব্যবস্থা করে তাহলে শরিয়তে নিষেধ নেই। তবে স্মরণ রাখতে হবে কোনোক্রমেই যেন তা বাড়াবাড়িতে ও সীমালঙ্ঘনের স্তরে না পৌঁছে।

আশুরার দিনে রোযা রাখা। তবে এর সাথে ৯ তারিখ বা ১১ তারিখ মিলিয়ে রাখা। কারণ নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, “তোমরা আশুরার দিনে রোযা রাখ। তবে এ ক্ষেত্রে ইয়াহুদীদের থেকে ভিন্নতা অবলম্বন করতঃ তোমরা আশুরার পূর্বে অথবা পরের একদিন সহ রোযা রাখবে।” (মুসনাদে আহমাদ: হা. নং- ২৪১)

এই দিন  বেশী বেশী তাওবা-ইস্তিগফার করা। কারণ নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, মুহাররম হলো আল্লাহ তা‘আলার (নিকট একটি মর্যাদাবান) মাস। এই মাসে এমন একটি দিন আছে, যাতে তিনি অতীতে একটি সম্প্রদায়কে ক্ষমা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অপরাপর সম্প্রদায়কে ক্ষমা করবেন। (তিরমিযী: হা. নং- ৭৪১)

দীনের খাতিরে এই দিনে হযরত হুসাইন (রাযি.) যে ত্যাগ-তিতিক্ষা প্রদর্শন করেছেন তা থেকে সকল মুসলমানের দীনের জন্য যে কোন ধরনের ত্যাগ ও কুরবানী পেশ করার শিক্ষা গ্রহণ করা।

আশুরায় বর্জনীয় কাজ সমূহ: তা’যিয়া বানানো অর্থাৎ, হযরত হুসাইন (রাযি.) এর নকল কবর বানানো। এটা বস্তুত এক ধরণের ফাসেকী শিরকী কাজ। কারণ মূর্খ লোকেরা ‘হযরত হুসাইন (রাযি.) এতে সমাসীন হন’ এই বিশ্বাসে এর পাদদেশে নযর-নিয়ায পেশ করে, এর সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ায়, এর দিকে পিঠ প্রদর্শন করাকে বেয়াদবী মনে করে, তা’যিয়ার দর্শনকে ‘যিয়ারত’ বলে আখ্যা দেয় এবং এতে নানা রকমের পতাকা ও ব্যানার টাঙ্গিয়ে মিছিল করে; যা সম্পূর্ণ নাজায়িয ও হারাম। এছাড়াও আরো বহুবিধ কুপ্রথা ও গর্হিত কাজের সমষ্টি হচ্ছে এ তা’যিয়া। (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৫/২৯৪,৩৩৫, কিফায়াতুল মুফতী: ৯/৩২, ফাতাওয়ায়ে রহীমিয়া: ২/৩৪৩)

‘হায় হুসেন’, ‘হায় আলী’ ইত্যাদি বলে বলে বিলাপ ও মাতম করা এবং ছুরি মেরে নিজের বুক ও পিঠ থেকে রক্ত বের করা। এগুলো করনেওয়ালা, দর্শক ও শ্রোতা উভয়ের প্রতি নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অভিসম্পাত করেছেন। (আবূ দাউদ: হা. নং- ৩১২, ইবনে মাজাহ: হা. নং- ১৫৮৪)

কারবালার শহীদগণ পিপাসার্ত অবস্থায় শাহাদতবরণ করেছেন তাই তাদের পিপাসা নিবারণের জন্য বা অন্য কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে এই দিনে লোকদেরকে পানি ও শরবত পান করানো। (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৫/২৮৯, কিফায়াতুল মুফতী: ৯/৪০)

একটি প্রসিদ্ধ ভ্রান্তির অপনোদন
অনেকেই না বুঝে অথবা ভ্রান্ত প্ররোচনায় পড়ে আশুরার ঐতিহ্য বলতে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয়তম দৌহিত্র, জান্নাতের যুবকদের সরদার হজরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত ও নবী পরিবারের কয়েকজন সম্মানিত সদস্যের রক্তে রঞ্জিত কারবালার ইতিহাসকেই বুঝে থাকে।

তাদের অবস্থা ও কার্যাদি অবলোকন করে মনে হয়, কারবালার ইতিহাসকে ঘিরেই আশুরার সব ঐতিহ্য, এতেই রয়েছে আশুরার সব রহস্য। আসলে বাস্তবতা কিন্তু এর সম্পূর্ণ বিপরীত। বরং আশুরার ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে প্রাচীনকাল থেকেই। হজরত হুসাইন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনার অনেক আগ থেকেই আশুরা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ও রহস্যঘেরা দিন। কারণ কারবালার যুদ্ধ সংঘটিত হয় ৬১ হিজরির ১০ মহররম। আর আশুরার রোজার প্রচলন চলে আসছে ইসলাম আবির্ভাবেরও বহুকাল আগ থেকে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, আবহমানকাল থেকে আশুরার দিনে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা যেমন অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি হিজরি ৬১ সনে আশুরার দিন কারবালার ময়দানের দুঃখজনক ঘটনাও মুসলিম জাতির জন্য অতিশয় হৃদয়বিদারক ও বেদনাদায়ক। প্রতিবছর আশুরা আমাদের এই দুঃখজনক ঘটনাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে এও বাস্তব যে এ ঘটনাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পেরে আজ অনেকেই ভ্রষ্টতা ও কুসংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জিত। যারা কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকে ব্যথাভরা অন্তরে স্মরণ করে থাকেন, তারা কোনো দিনও চিন্তা করেছেন যে কী কারণে হজরত হুসাইন (রা.) কারবালার ময়দানে অকাতরে নিজের মূল্যবান জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তাই তো অনেকেই মনে করেন যে জারি মর্সিয়া পালনের মধ্যেই কারবালার তাৎপর্য! হায়রে আফসোস! কী করা উচিত! আর আমরা করছি কী? হজরত হুসাইন (রা.)-এর উদ্দেশ্য ও আদর্শ বাস্তব জীবনে অনুসরণ করাই হবে এ ঘটনার সঠিক মর্ম অনুধাবনের বহিঃপ্রকাশ। হজরত হুসাইন (রা.)-ও রাসুলে করিম (সা.)-এর প্রতি মুহব্বত ও আন্তরিকতার একমাত্র পরিচায়ক।

হযরত হুসাইন (রাযি.) ও তাঁর স্বজনদের উদ্দেশ্যে ঈছালে সাওয়াবের জন্য বিশেষ করে এই দিনে খিচুড়ি পাকিয়ে তা আত্মীয়-স্বজন ও গরীব মিসকীনকে খাওয়ানো ও বিলানো। একে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষ যেহেতু নানাবিধ কু-প্রথায় জড়িয়ে পড়েছে তাই তাও নিষিদ্ধ ও না-জায়িয। (কিফায়াতুল মুফতী: ৯/৪০)

হযরত হুসাইন (রাযি.)-এর নামে ছোট বাচ্চাদেরকে ভিক্ষুক বানিয়ে ভিক্ষা করানো। এটা করিয়ে মনে করা যে, ঐ বাচ্চা দীর্ঘায়ু হবে। এটাও মুহাররম বিষয়ক কু-প্রথা ও বিদ‘আত। (ইসলাহুর রুসূম)

তা’যিয়ার সাথে ঢাক-ঢোল ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাজানো।(সূরায়ে লুকমান: ৬)

আশুরার দিনে শোক পালন করা; চাই তা যে কোন সূরতেই হোক। কারণ শরীয়ত শুধুমাত্র স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রীর জন্য ৪ মাস ১০ দিন আর বিধবা গর্ভবতীর জন্য সন্তান প্রসব পর্যন্ত এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুতে সর্বোচ্চ ৩ দিন শোক পালনের অনুমতি দিয়েছে। এই সময়ের পর শোক পালন করা জায়িয নেই। আর উল্লেখিত শোক পালন এগুলোর কোনটার মধ্যে পড়ে না। (বুখারী: হা. নং- ৫৩৩৪, ৫৩৩৫, ৫৩৩৬, ফাতাওয়ায়ে রহীমিয়া: ২/৩৪৪)

উল্লেখ্য: যে শরীয়ত কর্তৃক অনুমোদিত শোক পালনের অর্থ হলো শুধুমাত্র সাজসজ্জা বর্জন করা। শোক পালনের নাম যাচ্ছেতাই করার অনুমতি শরী‘আতে নেই। (দুররে মুখতার: ২/৫৩০)

শোক প্রকাশ করার জন্য কালো ও সবুজ রঙের বিশেষ পোশাক পরিধান করা। (ফাতাওয়ায়ে রহীমিয়া: ২/৩৪৪)

এই দিনের গুরুত্ব ও ফযীলত বয়ান করার জন্য মিথ্যা ও জা‘ল হাদীস বর্ণনা করা। কারণ হাদীসে মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারীকে জাহান্নামে ঠিকানা বানিয়ে নিতে বলা হয়েছে। (বুখারী: হা. নং- ১০৭)
এখানে আশুরার দিনের নিন্দিত ও গর্হিত কাজসমূহের কিছু নমুনা পেশ করা হলো মাত্র।

মূলকথা: বক্ষ্যমাণ পর্চার ‘করণীয়’ শিরোনামের অধীনে উল্লেখিত ৩টি আমল ব্যতীত এই দিনে আর কোন বিশেষ আমলের কথা শরী‘আতে প্রমাণিত নেই। তাই এই হলো ব্যতীত আশুরাকে কেন্দ্র করে বিশেষ যে কোন কাজই করা হবে তা বিদ‘আত ও মনগড়া আমল। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে শিরক, বিদ‘আত ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকার তাওফীক দান করুন।

image_pdfimage_print




     এই বিভাগের আরও খবর

আমরা আছি ফেসবুকে