“তুমি মিশ্রিত লগ্ন মাধুরীর জলে ভেজা কবিতায়
আছো সারোয়ার্দী, শের-এ-বাংলা, ভাসানীর শেষ ইচ্ছায়
…………………………………………
………………………………………….
আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি
জন্ম দিয়েছো তুমি মাগো, তাই তোমায় ভালোবাসি।”
এই গানে আমাদের দেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছে অত্যন্ত মেধাবী গীতিকার ও সুরকার প্রিন্স মাহমুদ। কলেজ জীবনে যখন নগরবাউল জেমসের কন্ঠে শুনেছিলাম, আজও মনে পরে – গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। আজও পশম দাঁড়িয়ে উঠে, সাথে গা শিউরে উঠে কারণ আমার সোনার বাংলা আজ ভালো নেই, আমার মা ভালো নেই।
আমাদের কিন্তু লজ্জা করেনা, আমাদের লজ্জা নেই। আমরা কোনো প্রতিবাদ করিনা, প্রয়োজন নেই। সোশ্যাল মিডিয়া আছে না? সেখানে শেয়ার করলেই আমাদের দেশের সবকিছুই পাল্টে যাবে, বদলে যাবে। আমাদের দেশে ছয় বছরের শিশু ধর্ষিত হয়েছে। ছয় বছরের শিশু, ভালো করে মুখে বোল ফুটেনি, এমন বর্বরতা কী, ধর্ষণ কী – সেটাই সে জানে না। অথচ! আহ! আমার দেশ, সোনার বাংলাদেশ।
আবুল বাসার পেশায় একজন ইমাম ও শিক্ষক। তিনি মঙ্গলবার বিকেলে তারই মাদ্রাসার ৬ বছরের এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। পরে স্থানীয়রা ঘটনা জানতে পেরে তাকে অবরুদ্ধ করেন। এই আবুল বাসার অত্র এলাকার ইমাম ও একটি মাদ্রাসার শিক্ষক, তার মতো লোক এমন নিকৃষ্ট কাজ করেন তাও আবার ষাট বছরের, কিছুই মাথায় আসছে না, শুধু আবুল বাসারকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করছে। অভিযুক্ত আবুল বাসারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে তাকে বলতে শোনা যায় ‘হয়তো শয়তানের ধোঁকায় পড়ে’ আমি এটা করেছি। তাকে তালাবদ্ধ করে নয়, প্রকাশ্যে গূহ্যদ্বার দিয়ে গরম ২৫ ইঞ্চি রড ঢুকিয়ে দিতে চাইছে শয়তান কারণ শয়তানের ধোঁকা থাক দূরের কথা, কোনো ধরনের শয়তানের পক্ষেই এই কাজ করা সম্ভব নয়।
মেয়েটির মাকে বলতে শুনি,“আমি আমার মেয়েকে শিক্ষক আবুল বাসারের কাছে পড়তে পাঠাই। তিনি আমার মেয়ের সঙ্গে খারাপ কাজ করার চেষ্টা করে। আশেপাশের লোক বিষয়টি জানতে পেরে আমার মেয়েকে উদ্ধার করে। একজন শিক্ষক হয়ে সে এমন একটি কাজ করলো, এই ঘটনার আমি বিচার চাই। সে যাতে আর কারো সাথে এমন ঘটনা না ঘটাতে পারে।”
কিন্তু মা, আপনি কী জানেন না আমাদের রোগাক্রান্ত দেশের কথা? আপনি কোন ভরসায় পাঠালেন মেয়েটাকে? আপনি কী বিচার চাইবেন মা? কিসের বিচার, বলেন? গত ২০২৪ সালে আমাদের দেশে ধর্ষিত হয়েছে ৫,৫৬৬ জন, ২০২৫ সালে ৭,০৬৮ জন ! মাত্র এক বছরেই ধর্ষণের হার বেড়েছে কতো শতাংশ, জানেন মা? নিশ্চয়ই জানেন না। ২৭ শতাংশ, মাত্র ২৭ শতাংশ! আর ২০২৬ সালের শুধু জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ২৪৫ টি ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে। হিসেবটা উর্ধ্বগতিতে বাড়ছে? আপনি বিচার চেয়েছেন, বিচার হবে। এক/দুই কিংবা যাবজ্জীবন কারাবাস অথবা আরও মজার ঘটনাও ঘটতে পারে, ধর্ষকের সাথে বিয়ে। হ্যাঁ, এটা আমাদের দেশেই হয়েছিলো, হচ্ছে এবং দেশ, জাতি ও প্রশাসন যদি সোচ্চার না হয়, তাহলে আরও হতেই থাকবে। এই বাংলায় প্রতি ৯ ঘণ্টায় অন্তত ১ জন নারীকে ধর্ষণ করা হচ্ছে। আহ ! আমার বাংলা !
আমার তনুর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে তো এতোটা ছোটো ছিলো না গো মা! তনুর মতো করে আমি তোমার মেয়ের বিচার চাই না, কেনো? জানবে না তুমি, আমি জানাতেও পারবো না, আমার সেই সাহস নেই। ছয় বছরের মেয়ের বিচার চাওয়া, যে চাওয়ায় দেখবে কঠিন থেকে কঠিনতর হত্যা হুমকির খড়গ আসে বোবা বনবাসে । যে চাওয়ায় ভাদ্র মাসের কুকুরের লালাভ জিভের শব্দে কর্ণ পর্দা ফেটে আসে । যে চাওয়ায় অসুস্থ আর সন্তানহারা মা-বাবার বিষাক্ত প্রশ্নের ছোবল খেতে হয় । যে চাওয়ায় বুঝতে হয় তোকে নিয়ে বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভ্রুণ বর্বোরোচিতের আশ্রয় । যে চাওয়ায় বিচার বিচার খেলায় সময় কাটিয়ে দিতে চায় অমানব পশুবরেরা । যে চাওয়ায় ক্ষিপ্ত আর হিংস্র হয়ে উঠে আরো-সেই আদিম অসভ্যের ধারকেরা । যে চাওয়ায় তোর রেখে যাওয়া সেই সব শাখা স্বপ্নের জাল ছেঁড়ে মূল হোতারা ।
“যে দেশের রক্ষকেরা রাক্ষুসে ভক্ষকের রক্ষক হয়ে তাদের পাশে দাঁড়ায় । যে দেশের সবাই জানে অবোধ এক কুঁড়ির না ফোঁটার মালীকে । যে দেশের সবাই জানে তলিয়ে যাবে অতল গহ্বরে বিচারের বাণী । যে দেশের সবাই জানে – ওরা মেনে নিতে পারে সহজেই।”
ওরা কখনোই আমাদের কান্না শুনবে না । আমাদের আর্তনাদ , হাহাকার , প্রতিবাদ , যন্ত্রণা তাদের কানে তানপুরার সুর হয়ে বেজে উঠে । আমি তাদের বিচার চাই – যারা কিংবা যার পর্যাপ্ত ক্ষমতা থাকা স্বত্তেও নারীত্বের অবমূল্যায়ন করে । ছিঃ ছিঃ – ধিক্কার সেই নাটাইয়ের সূতো ছাড়া নর্তকীর মানসিকতায় বেড়ে উঠা তাঁর সন্তানের দূর্ভাগ্যের দায় এড়িয়ে দিব্যি চষে বেড়ায় ছয় বছর বয়সী শিশুদের, মেয়েদের কিংবা মায়েদের চোখের সামনে । এই লজ্জা রাখার স্থান এই দেশের বাতাসেও নেই আর তাই বলতেই হয় – অদ্ভুত উটের পিঠে চলছে একাত – ওকাত হয়ে আমার স্বদেশ আর ভবিষ্যত ।
ক্ষমা করে দিস – যারা তোকে প্রকৃতির অবাধ সবুজ , নরম ঘাসের গালিচায় তোর স্বপ্নের বিচরণ সহ্য করেনি – আমি অন্তত তাদের কাছে তোর ধর্ষণের বিচার চেয়ে তোকে ছোট করতে চাই না । দেখে নিস – জানি তুই ঐ আকাশের প্রজ্জ্বোলিত তারা হয়ে ওদের উপর ওদের সহায়েরই বর্বরতা। তুই দেখে নিস কিন্তু ! আমরাও প্রতীক্ষায় রইলাম – কতো সম্ভ্রম লুটের পর ওদের ক্লান্তি আসে ওদের নিরাপদ আশ্রয়ের দরোজায়।
