12:52 PM, 21 May, 2024

লজ্জার কিছু নেই,আছে মেনে নেয়ার মত ম্যাচিউরিটি

দিন দিন আমাদের বয়স বাড়ছে, বয়সের সাথে বাড়ছে শরীরে রোগ, দূর্বলতা, ব্যাথা ও সবচেয়ে বেশি বাড়ছে হাড় ক্ষয়। এসব কারনেই এক সময় আমরা যে সকল কাজ বিন্দাস করে ফেলতে পারতাম চুটকিতে, সেসব করতে এখন হাঁপিয়ে উঠতে হয়। তার আধাও করতে পারি না।

এই যেমন, এক সময় বহু মানুষের বাচ্চা কোলে নিয়ে হাঁটার জন্যে, দেখাশোনা করতেও আমাকে সঙ্গী করতো অনেকেই। বাচ্চা ভালবাসতাম বলে আমিও নির্দ্বিধায় যেতাম ও বহু সময় বেবি নিয়ে হাঁটতে পারতাম। আর এখন এমন সময় এসেছে, নিজের বেবিকে কোলে নিয়েই কিছুদূর চলতে পারি না, কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না, এমন কি রিকশায় পর্যন্ত উঠতে পারি না। কারন হলো সেই হাড়ে ক্ষয়। যার কারনে রগে টান লাগার ব্যথা পায়ে, কোমরে। তারমধ্যে আবার সিজার।

বয়স তো বেড়েই চলেছে। মেনে নিতেই হবে আমাদের। আগের মত এখন আর বাসের দরজায় ছেলেদের সাথে ঝুলে ঝুলে চলা সম্ভব হবে না। এখন হয়তো আগের মত বাসের সীট ছেড়ে অন্য কাউকে বসতে দিয়ে পুরো রাস্তা দাড়িয়ে ঝুলে ঝুলে যেতে পারবো না। এখন হয়তো আগের মত শ্যামলী থেকে কাজীপাড়া বা সেনপাড়া থেকে মিরপুর ১, ২ নাম্বার হেঁটে আসা যাওয়াও করা যাবেনা।

এলাকার ছোট আপু থেকে এলাকার বড় আপা হয়ে যাওয়ার রাস্তা খুব বেশি বড় হয় নি। হয়তো বা মুটিয়ে যাওয়া শারীরিক গঠন বেশি সময়ও দেয় নি। একটা সময় রাগ হতো বয়স কম হলেও আপা, আন্টি, খালাম্মা শুনলে। এখন আর কিছুই মনে হয় না। বরং আমার কিছুটা বড় যাদের এক সময় ভাইয়া বা আপু বলতাম, আপনি করে ডাকতাম, এখন সেটা ডাকতে মন চায় না। হয় ওরা সব আমার অনেক ছোট৷ তাই নাম ধরে, তুমি করে বলতে মন চায়। মনে হয়, এখন তো আমি এলাকার আপা ই হয়ে গেছি। যেখানেই যাই, আপা এটা, আপা ওটা।

এখন বরং এমন সিনিয়র কাউকে আমায় নাম ধরে বা তুমি করে ডাকলে বিব্রত হয়ে যাই। মনে হয়, “এমা! উনি দেখি আমাকে বাচ্চা মেয়ে মনে করছে। আমি তো এখন একটা বাচ্চার মা৷” ডাক্তার বা দোকানে বা কোর্টে এমন সিচুয়েশনে বহু পরতে হতো। ভুলেই যেতাম যে, বয়সটা এতও বেশি হয় নি যে আমার থেকেও বহু বছরের সিনিয়ররা আমাকে তুমি বলতে পারবে না, নাম ধরে ডাকতে পারবে না।

যাই হোক, অনেককেই দেখি বয়স হয়ে যাচ্ছে বিষয়টা মানতেই পারে না। অথচ নিজেরাই বলে, আগে পারতাম। এখন আর পারি না। আর শরীরে সয় না। বলাই বাহুল্য যে, বয়স হয়েছে। পাশাপাশি তাদের হাড়ের ক্ষয়ও হয়ে চলেছে। এক সময় যে ভারী কাজ একাই সারতো, সেটা এখন সম্ভব নাও হতে পারে। চেষ্টা করলে হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে। নয় কি?

একসময় মানতে কষ্ট হতো। কারন বয়স কম ছিল। এখন আর হয় না। কারন, বয়স বেড়েই চলেছে। তবে আমার বরাবরের স্বভাব, কেউ বয়স বা জন্ম সাল জিজ্ঞাসা করলে একদম হিসেবে হিসেবে সঠিকটা বলে দেই। ভুলেও সার্টিফিকেটেরটা বলি না। কেউ বললে পছন্দও করি না।

তারমধ্যে কেউ যদি ভুলটা বলে বা ভুল হিসাব করে বা পড়ালেখার সাল দিয়ে বয়স হিসাব করতে যায় তখনই মেজাজ খারাপ হয়ো যায়। কেননা, সার্টিফিকেটে সবারই ২/৩ বছর কমানো থাকে। সবার তো আর আমার মত সার্টিফিকেট নাই যে, ৬ মাসের কম-বেশি বানিয়ে বসে আছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

তাছাড়া সবার স্কুলে ভর্তি বা পড়ালেখার সিস্টেমও এক নয়। এই যেমন, সবাই প্লে, নার্সারী, কেজি এসবে কয়েক বছর লস করার সুযোগ পায় না। সরাসরি ওয়ানে ভর্তি হয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই ওরা পড়ালেখা আগে শেষ করবে। সেক্ষেত্রে যারা কেজি স্কুলে পড়ে পাশ করে, তাদের পড়ালেখা ৩ বছর পরে শেষ হবে। তেমনই, যেখানে প্রাইভেটে পড়া হয়, তাদের পড়ালেখা আগে শেষ হয়। সরকারীভাবে সেশন জটে আটকে আটকে বয়স বেড়ে তারপর সার্টিফিকেট মিলে। এখন সেশন সাল দিয়ে একজনের বয়স কি করে মাপা সম্ভব যদিও অনেকেই সেটা করে থাকে।

এখন মনে হয়, কেন বহু মানুষ সার্টিফিকেটের বয়স বলতে চায় আসল না বলে। বয়স সেখানে কমানো যে থাকে। আমার তো সেই ভাগ্যও নেই। কারন সার্টিফিকেট ও আসল বয়সের মাঝে মাত্র ৬ মাসের ব্যবধান। তাই আসলটাই আকড়ে বসে আছি আজীবন। নকল দিয়ে কি করবো!

মেনে নিতে হবে সবাইকেই, হ্যাঁ! আমাদের বয়স বাড়ছে। আমরা আসলেই আর বহু কিছুই করতে পারি না বা পারবো না যা আগে করতাম বা করতে পারতাম। এতে লজ্জার কিছু নেই। আছে মেনে নেয়ার মত ম্যাচিউরিটি।

মারুনা রাহী রিমি, লেখক ও কলামিস্ট 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *