2:08 PM, 14 February, 2026

কুড়িয়ে পাওয়া রক্তে ভেজা এক মুক্তিযোদ্ধার চিঠি

Screenshot_1

কুড়িয়ে পাওয়া রক্তে ভেজা এক মুক্তিযোদ্ধার চিঠি

 একদিন রাস্তা দিয়ে যাবার সময় দেখি একটা কাগজের টুকরো পড়ে আছে । এটাকে দেখে আমি হাতে তুলে নিলাম এবং ধূলো-বাল পরিষ্কার করে নলাম । চিঠিতে দেখি রক্তের দাগ । তারপর খুলে দেখি এক মুক্তিযোদ্ধার লেখা চিঠি ।

রুমি,
শুভেচ্ছা নিও । আহত হৃদয়ের করুণ দীর্ঘশ্বাস জেনো । তোমার বাসার খোঁজ করে জানতে পারলাম তোমরা সুখেই আছো । আশা করি এই চিঠি তুমি সুস্থ ও সতেজ মনেই পাবে । আমার চিঠিখানা পেয়ে তোমার অবাক হওয়ার কথা । কারন তুমি এখন বিবাহিত । তোমরা আজ রঙিন মালা গাঁথায় ব্যস্ত । আর আমি যুদ্ধক্ষেত্রে । তুমি হয়তো ভাবছো তোমার পরিবর্তনের সাথে সাথে সত্য অতীত বস্তুটারও বিলুপ্তি ঘটেছে । আসলে কি তাই ? আজ থেকে প্রায় ২৩ – ২৪ বছর পূর্বে থেকে তুমি ছিলে আমার ছোটবেলার ও যৌবনের সাথী ।

১৯৭১ সালের মে ১৫ তারিখ আমি চলে যাই যুদ্ধে । কথা ছিলো যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে আমি তোমার হাতে মেহেদি পড়াবো । যুদ্ধের শেষে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে গুলিবিদ্ধ হয়ে যখন পঙ্গু হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলাম ঠিক তখন আমি তোমার বিয়ের কথা শুনতে পেলাম । সমাজের প্রতিষ্ঠিত মিঃ নয়ন চৌধুরীর সাথে । নয়ন আমার বাল্যবন্ধু । আমাদের পাশের বাড়িতেই থাকতো । আমরা একসাথে যুদ্ধে যাই । কিন্তু আশ্চর্য একটাই ! নয়ন আজ সমজপতি আর আমি এক প্রকার থাক না থাকা – তবু তোমাকেই বলছি ।

সেইদিন নয়ন যুদ্ধের নামে করেছিলো ডাকাতি আর লুট । প্রতি রাতে অপারেশনের নামে বেড়িয়ে যেতো তাবু থেকে আর গভীর রাতে ব্যাগভর্তি স্বর্ণ, টাকা পয়সা ইত্যাদি নিয়ে আসতো । যুদ্ধ এর অর্থ ছিল দেশের মানুষকে সুখে রাখ এবং দেশকে শত্রুদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা । কিন্তু যুদ্ধের অর্থ নয়নের মত ছিলো না ।

আমি একদিন রাতে নয়নকে প্রশ্ন করি, যুদ্ধের নামে তুই এসব কি করছিস ? সে বলল, যুদ্ধ মানে জীবন দান নয়, যুদ্ধ মানে সুযোগের সন্ধান । জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করা ।

একদিন যুদ্ধ শেষ হয় । আমি একটা পা হারিয়ে হাসপাতালে । কিছুদিন পরে বাড়িতে এসে দেখি বাড়িটা পুরো শূণ্য । আর নয়নরা গ্রামের বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে শহরে । সেদিনের ছদ্মবেশী রাজাকার আজ সমাজ ও দেশের সেবক । বিভিন্ন পত্রিকায় লিখেছে, মুক্তিযোদ্ধা মিঃ নয়ন চৌধুরীর দেশপ্রেম ।

তোমাকে আঘাত দেবার জন্য এই লিখা নয় । যা চরম সত্য – তাই জানালাম । তোমাকে আর বিরক্ত করতে চাই না । তুমি সুখে থেকো – এই কামনা নিয়ে শেষ করছি ।

ইতি
তোমারই মুক্তিযোদ্ধা

 

চিঠি সংগ্রাহক: অকাল প্রয়াত প্রিয় দাদা শেখর মজুমদার বিপ্লব