,

সৌদি আরবে আল-হানুফ কোম্পানিতে শ্রমিক ধর্মঘট!

সোহেল ডি.এম.রানা,রিয়াদ, সৌদি আরবঃ

সৌদি আরবে রিয়াদের আল-কুজামায় আল-হানুফ গ্রুপ অব কোম্পানীতে বকেয়া বেতনের দাবিতে শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকেছে। ৫-৬ মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ সহ কোম্পানীর কাছে ৬টি দাবি নিয়ে তাদের এই অবস্থান।

সৌদি আরবে শ্রমিক অসন্তোষের মাত্রা প্রকট আকার ধারণ করেছে। শ্রমিকের বেতন, আকামা ঠিকমত না দেয়া সহ নানা সমস্যায় জর্জরিত সৌদি আরবের নামীদামী কোম্পানিগুলো। ইতিমধ্যে অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেকগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম চলছে। সরকারের নতুন আইন কানুনের গ্যাড়াকলে অনেক প্রবাসী মানবেতর জীবন যাপন করছে। আবার অনেকে দেশে যেতে চাইলেও যেতে পারছে না নানা কারণে। সৌদি আরবের বৃহৎ একটি গ্রুপ অব কোম্পানী আল হানুফ (Al- Hanouf Group)। রিয়াদ,মক্কা, জেদ্দা, আবা, ইয়ানবু, জিজান, নাজরান,আল-খারিজ, দাম্মাম সহ আরো অনেক প্রজেক্টে এই কোম্পানির শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু তারা ঠিকমত বেতন পান না। প্রতি প্রজেক্টেই শ্রমিকের ৫/৬ মাসের বেতন বাকী আছে। দেখা যায় প্রতি মাসেই কোন না কোন প্রজেক্টে ধর্মঘট করে বেতন নিতে হয় । অবশ্য দিলেও তা এক মাসের বেশী নয়। ইতিমধ্যে কোম্পানীটির সিংহভাগ লোকের আকামার মেয়াদ চলে গেছে। নতুন করে আকামার মেয়াদ না বাড়ানোই প্রায় প্রতিদিনই সৌদি পুলিশ ও সিআইডির হাতে ধরা পড়ছে আল-হানুফের অসংখ্য লোক। যদিও সৌদি আইনে আকামার মেয়াদ বা অন্য কোন বৈধ কাগজপত্রের সমস্যা থাকলে ভুক্তভোগী ঐ কোম্পানিকে জরিমানা করার কথা। কিন্তু এখন তা না করে সরাসরি ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে ঐ শ্রমিককে দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

গত দুমাসের পরিসংখ্যানে শুধু রিয়াদ থেকেই আল- হানুফের ৭৫ জন শ্রমিককে দেশে পাঠিয়েছে। অথচ তাদের প্রত্যেকের আকামা ছিল। শুধুমাত্র মেয়াদ উর্ত্তীণ হওয়ার কারণে আজ তাদের বলি হতে হলো।

খবর নিয়ে জানা গেছে, এখনো কিছু লোক জেলে বন্দী আছে। তারাও হয়তো দু/চার দিনের মধ্যে দেশে ফেরত চলে যাবে। কোম্পানীটির শ্রমিকরা এতোটায় নিরুপায় এবং অসহায় যে, তাদের ধরে নিয়ে গেলে উক্ত কোম্পানির কোন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা তাদের বের করে আনবে তো দূরের কথা তাদের খবরটা পর্যন্ত নেয় না। আর তাদের যে ৫/৬ মাসের বেতন বাকী আছে, তা তো দেয়ার প্রশ্নই আসেনা। রিয়াদ প্রজেক্টের আল-হানুফ এর কাজ্জানের শ্রমিককেরা থানা নিকটবর্তী হওয়ায় প্রতিদিনই আতংকের মধ্য থাকেন কখন তাদের ধরে নিয়ে যায়। তাছাড়া রিয়াদে আল-হানুফের অন্যান এলাকা যেমন আল-মাজাল,উমর হামাম,সালাম পার্ক,আব্দুল্লাহ পার্ক সহ অন্যান্য জায়গায় প্রায় প্রতিদিনই সৌদি পুলিশের শিকার হচ্ছেন তারা। এমতাবস্থায় কোন উপায়ন্ত না পেয়ে রিয়াদের আল-কুজামার — আল-আমাল প্রজেক্টের, হানুফ শ্রমিকগণ ৬ দফা দাবী নিয়ে ধর্মঘট ডেকেছে। তারা একটা স্মারকলিপি ইতিমধ্যে কোম্পানিতে প্রেরণ করেছে।

দাবিগুলো হলোঃ

১. এক সপ্তাহের মধ্যে মেয়াদ উর্ত্তীণ সকল আকামা নবায়ন ( রেনু) করতে হবে।

২. ৪ মাসের বেতন একত্রে দিতে হবে এবং পরিবর্তীতে প্রতি মাসে ১-৫ তারিখের ভেতরে বেতন পরিশোধ করতে হবে।

৩. পুলিশ কাউকে ধরে নিয়ে গেলে কোম্পানির লোক গিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে হবে।

৪. তিন মাসের ছুটিতে গেলে কোন টাকা কাটতে পারবেনা এবং কোন গ্যারান্টার থাকবেনা।

৫. বিমান টিকেট অথবা সম পরিমাণ টাকা দিতে হবে।

৬. ছুটি যাওয়ার সময় তার সকল হিসাব নিকাশ দিয়ে দিতে হবে এবং ছুটি থেকে আসার পর প্রথম মাস থেকেই বেতন দিতে হবে।

উপরোক্ত এ দাবী না মানা পর্যন্ত শ্রমিকরা ধর্মঘট চালিয়ে যাবে এবং কাজে যোগদান থেকে বিরত থাকবে । যদি অচিরেই এর সমাধান না হয় তাহলে পরবর্তীতে আরও কঠোর কর্মসূচী দিবে বলে তারা হুমকি দিয়েছে।

এদিকে কোম্পানির আবুল কালাম নামের এক শ্রমিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, তার আকামার মেয়াদ চলে গেছে ৪ মাস হলো, সে ছুটি যেতে চায়। ছুটির আবেদন দিয়ে রেখেছে অনেক আগেই কিন্তু আকামা নবায়ন না হওয়ার কারণে সে যেতে পারছেন না। এমনকি পরিবারের জন্য মার্কেটে কেনাকাটা করতেও ভয় পাচ্ছে সে।

হারুন নামে পঞ্চাশোর্ধ অপর এক ব্যক্তি বলেন তিনি ১৬ বছর যাবত এই কোম্পানিতে আছেন তিনি এখন দেশে ফিরতে চান একেবারে। কিন্তু তারও আকামার মেয়াদ না থাকায় দেশে ফিরতে পারছেনা। কোম্পানির কথা বলতে গিয়ে বলেন বর্তমানে এই কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের মত নাজুক অবস্থা অন্য কোন কোম্পানীতে আছে কিনা তার সন্দেহ।

কালাম ও হারুনের মত আরও অনেকেই নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেছে। যদিও এর আগে কয়েকবার কোম্পানির বিভিন্ন কর্মকর্তারা আশ্বাস দিয়েও এর কোন উন্নতি করতে পারেন নি। সুতরাং আশা করি এই ৬ দফা দাবী দ্রুত মেনে নিয়ে তাদের কাজে যোগদানের সুযোগ করে দিবে কোম্পানি। প্রতিজন প্রবাসী বহু স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়। কেউ বাবার স্বপ্ন কেউ মায়ের কেউবা তার সন্তানের স্বপ্ন পূরণে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কষ্ট করে শুধু তাদের পরিবারের জন্য। নিজে খেয়ে না খেয়ে হাসি ফুটাই ঘরে বৃদ্ধ বাবা মা কিংবা স্ত্রী সন্তানের জন্য। এখন স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই যদি কোম্পানির গাফিলতি বা অন্য কোন কারণে দেশে ফেরত যেতে হয় তাহলে এই মানুষগুলোর দায়ভার কে বহন করবে? সরকার নাকি জনগণ!!

image_pdfimage_print











     এই বিভাগের আরও খবর

আমরা আছি ফেসবুকে