,

শীতের আগমন

ষড়ঋতুর দেশে হেমন্ত মানেই শীতের আগমনী বার্তা। গাছের ঝরা পাতা, শিশির ভেজা ঘাস কিংবা ঘন কুয়াশায় চাদরে ঢাকা প্রকৃতি।
সব মিলিয়ে শীতের পরশ একটু একটু করে লাগতে থাকে গায়ে। আর একসময় তা রূপ নেয় কনকনে ঠাণ্ডায়। তখন একটু উষ্ণতা ভরিয়ে তোলে মন। এই তো শীতকাল। কুয়াশার ফাঁকগলে আড়মোড়া কাটিয়ে পূব আকাশে সূর্যের উঁকি। কিংবা সবুজ ঘাসের বুকে চিকচিক শিশির ফোঁটা এই তো শীত। ষড়ঋতুর দেশে হেমন্ত মানেই প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা। পালা বদলের দোলায় গা ভাসায় গাছপালাও। উত্তরের বাতাসে পাতা ঝরার মুড়মুড় শব্দে মেতে উঠে সবাই। শহরের দালান কোঠায় শীতের উষ্ণতা একটু দেরিতে এলেও গ্রামীণ জনপদে আগেই পাওয়া যায় সরব উপস্থিতি। গরম কাপড়ের খোঁজে দোকানে দোকানে চলে আনাগোনা। বিত্তবানদের কাছে শীত উপভোগের হলেও খেটে খাওয়া মানুষের কাছে শীত বেশ অস্বস্তির।

দুর্বাঘাসের মাথায় শিশির বিন্দু ও সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত হালকা কুয়াশা জানিয়ে দিচ্ছে প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা। পৌষ-মাঘ দুই মাস শীতকাল হলেও আমাদের দেশে শীত শুরু হয় কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে। সে অনুযায়ী প্রকৃতির নিয়মে পাকুন্দিয়াসহ গোটা দেশে শুরু হয়েছে শীতের আমেজ।
বিকেল থেকে শীতল হাওয়া আর সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয়ে ভোরের হালকা কুয়াশায় সকালের সূর্য উঠার পর দীর্ঘসময় পর্যন্ত গাছ গাছালিতে জমে থাকা শিশির বিন্দু বলে দিচ্ছে শীত এসেছে। এখন সকাল থেকে দিনভর আকাশ থাকে মেঘাচ্ছন্ন। দেখলে মনে হয় গোটা দেশে পুরো শীত মওসুম চলছে। শীত মানে অনেকের কাছে আনন্দের আর কারও কাছে যন্ত্রণার। তবে বেশিরভাগ মানুষ শীত মওসুমকেই পছন্দের সময় হিসেবে গণ্য করেন। শীতের সময় ভ্রমণপ্রেমীরা বিভিন্ন জেলার পর্যটন এলাকায় ঘুরে বেড়িয়ে থাকেন। তবে শীত মানে ভাপা পিঠার মধুর গন্ধ। শীত মানে সকালে মিষ্টি খেজুর রসের সঙ্গে মিতালী। শীতের সময় যতসব রুচিশীল খাবারের আয়োজন চলে গ্রাম কিংবা শহরে। পাকুন্দিয়ায় সকালে কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে গ্রাম বা শহরের রাস্তা-ঘাট। সকালে তাপমাত্রা কম থাকার কারণে অনুভূত হচ্ছে শীত। বিশেষ করে কার্তিক মাস পড়ার পর থেকে কুয়াশা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোরে দুর্বাঘাসের মাথায় শিশির বিন্দু জানিয়ে দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। তাই সবখানেই শীতের আমেজ বইতে শুরু করেছে। শরতের বিদায়, হেমন্তের আবির্ভাব। দিনের দৈর্ঘ্য হ্রাস। নিম্নচাপে বৃষ্টি, যা বইয়ে দিচ্ছে শীতল হাওয়া। এ যেন শীতের আগমনী বার্তা।
যদিও বাংলা পঞ্জিকার হিসেবে হেমন্তের পর অগ্রহায়ণ পেরিয়ে তবেই আসবে শীতকাল। কিন্তু প্রকৃতির খেয়ালে হেমন্তের শুরুতেই শীতের আগাম আমেজ অনুভূত হচ্ছে। এতে বোঝায় যাচ্ছে, কুয়াশা পড়া শুরু না হলেও তাপমাত্রা হ্রাসের সঙ্গে বৃষ্টি ও শীতল হাওযা- একটা শীত শীত আমেজ ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিরাজ করছে।
তবে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান যতই কমবে শীত শীত ভাব তত বেশি অনুভূত হবে। তখন দিনের ও রাতের তাপমাত্রা দুটোই কমে আসবে। হেমন্তের শুরুতে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ, বৃষ্টি-এক কথায় শীতের আগমনী বার্তা। তবে আরেক শ্রেণির মানুষ এই শীত শীত আমেজকে সাময়িক বলে মনে করছেন। তাদের দাবি, বৃষ্টির কারণে সারাদেশে তাপমাত্রা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। যে কারণে কিছুটা শীত শীত অনুভূত হচ্ছে। তাদের মতে, শীতের আগমণ কি না সেটা বুঝতে নিম্নচাপ কেটে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

প্রকৃতিপ্রেমী রবীন্দ্রনাথ হেমন্ত নিয়ে ছিলেন সংযত ও মিতবাক। ব্যাতিক্রম শুধু রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ।  জীবনানন্দের কবিতায় হেমন্তের আসল রূপের দেখা মেলে।

তিনি লিখেন, ‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপর মাথা রেখে,
অলস গেঁয়োর মতো এই খানে কার্তিকের ক্ষেতে;
মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার,
চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,/
তাহার আস্বাদ পেয়ে পেকে উঠে ধান’।

হেমন্তের প্রথম দিন পার হয়েছে বেশ আগে। পঞ্জিকার হিসেবে শীত আসতে এখনো অনেক সময় বাকি। তবে শীতের আগমনী বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের মেঠো পথে। ভোরে সাদা চাদরে ঢেকে যাচ্ছে পথঘাট। শিশির জমছে ভোরের  ঘাসে। তবে আমলকির ডালে ডালে শীতের হাওয়ার নাচন লাগবে আরো বেশ কিছু দিন পর।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কার্তিক মাসের কপালে নিন্দা-মন্দ কম জোটেনি। কার্তিক মানেই আমরা জানি মঙ্গা আর অভাব। এই ঋতুতে ফুলের বাহার নেই, নেই পাখির মধুর ডাক। নেই ঝড় ঝঞ্জার শক্তি। দ্বীন-দরিদ্র  মানুষের কাছে কার্তিকের আগমনের মধ্যে নতুন কোন তাৎপর্য বয়ে আনে না । তবু প্রকৃতির পালাবদলে সে বারবার ফিরে আসে। শেষ হচ্ছে সেই কার্তিক। শুরু হচ্ছে অগ্রহায়ণ।

এতো কিছুর পরও কার্তিকের ললাটে স্তবস্তুতি জুটেছে ঢের।  কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে সে প্রতিবছর আসে শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে। কুয়াশার আবরণের ফাঁকে সোনালী সোপানের আভাস দেয় কার্তিক।  হেমন্তের পাকা ধান নবান্নের উৎসব ফিরিয়ে আনে অভাবীদের ঘরে। ‘দুঃখের পরে সুখ আসে’ প্রবাদের বড় প্রমাণ হেমন্ত।

কার্তিকের পরেই সমৃদ্ধির অগ্রহায়ণ। হেমন্তের তখন এক অন্য রূপ। মাঠে মাঠে বাতাসে দোল খায় সোনালী ধানের ছড়া। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘ও মা,  অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে কী দেখেছি
আমি কী দেখেছি মধুর হাসি।’

জেগে উঠে নতুন কর্মোদ্দীপনা। ফসল কাটার ব্যস্ততা। ধানের আটি নিয়ে পথ চলার দৃশ্য। কৃষকের আঙিনায় নতুন খড়ের গাদা। তাপ মাত্রা দ্রুত কমতে থাকে। বাতাসে গা শির শির করে শুরু হয় শীত। গ্রামে গ্রামে খেজুর রস গুড়ের পিঠা-পায়েস তৈরির ধুম পড়ে। তাইতো কবি সৌম্যকান্তি চক্রবর্তীর লিখা কবিতায় মনে পড়ে ‘শীত ও তন্দ্রা’ কবিতাটি-

শিশির ঝরা ঘাসে
শীতের আগমনী ..
শীতল শীতল মলয় আবেশে
পাতা খসার ধ্বনি !

নতুন নতুন শীত বন্ধুর
সেই পুরাতন ছোঁয়া …
ঠাণ্ডা সকাল ঠাণ্ডা রাতে
শীতের পরশ পাওয়া !

ওগো বন্ধু তুমি বিজন রাতে
থেকো মোর সাথী হয়ে ,
মিত্র স্বজন নাই বা হলে ;
কাছে থাকো কথা কয়ে !

রাত্রি তমসা যাত্রী আঁধার ,
সাথী শুধু আছে উপাধান ;
গভীর ভাবনা স্বপ্ন অপার !
নিদ্রাহীন এ তন্দ্রা প্রধান ||

এসময় আবার বেড়ে যায় রোগের প্রাদুর্ভাব। ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাওয়ায় বিপৎজনক হয়ে ওঠে সড়কপথ। বাংলাদেশে শীতের প্রকোপ বেশি হয় উত্তরের জেলাগুলোতে। আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়’ এবছরও তার ব্যতিক্রম হবে না। সবকিছুর মাঝেও শীত অনাবিল আনন্দ আর উপভোগের হয়ে ওঠে সবসময়ই। তাইতো কবি সুকান্ত বলেছেন, “হে সূর্য তুমি আমাদের স্যাঁত স্যাঁতে ভিজে ঘরে, উত্তাপ আর আলো দিও আরো আলো দিও, রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।”

গত কয়েকদিন থেকে সকাল ও সন্ধ্যায় বাতাসের তাপমাত্রা কমে আসায় সকালের দিকে শীত অনুভূত হচ্ছে। ভোর রাতের দিকে গরম কাপড় গায়ে জড়াতে হচ্ছে লোকজনকে। এতে করে সর্দি, কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। বিশেষ করে বৃদ্ধদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। হাসপাতালে প্রতিদিন বাড়ছে সর্দি জ্বর ও কাশিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। ঋতু বৈচিত্র্যের কারণে এ জনপদের প্রকৃতিতে আগাম শীতের আগমন ঘটেছে।

মো. স্বপন হোসেন, কামিল মাস্টার্স, আল কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অধ্যয়নরত, মঙ্গলবাড়ীয়া কামিল মাদরাসা, পাকুন্দিয়া, কিশোরগঞ্জ।

image_pdfimage_print











     এই বিভাগের আরও খবর

আমরা আছি ফেসবুকে

পুরাতন খবর

নভেম্বর ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« অক্টোবর    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০