7:56 AM, 17 April, 2026

মঞ্চ একজন অভিনেতার ভিত্তি তৈরি করে – তমা হোসেন

মঞ্চ একজন অভিনেতার ভিত্তি তৈরি করে – তমা হোসেন

অভিনেত্রী তমা হোসেন

আমার নিন্দুকেরাই আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা” – বলছিলেন ১০ই আগস্টে ঢাকায় জন্ম নেয়া অভিনেত্রী তমা হোসেন। বর্তমানে তিনি ঢাকাতেই বসবাস করছেন। সাধারণ একটা পরিবারে জন্ম নেয়া একজন। ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় বেড়ে ওঠা, একটু নিজের মতো থাকতে ভালো লাগতো, কল্পনার জগৎ ছিলো আলাদা। পরিবার সবসময় পাশে ছিলো, যদিও শুরুতে তারা আমার এই জার্নিটা পুরো বুঝতে পারেনি। কিন্তু আস্তে আস্তে তারা বুঝতে পেরেছে যে, আমি সময় নষ্ট করছিনা। মঞ্চে কাজ করতেন আগে থেকেই, ছোট পর্দায় বিটিভির একটা মিনি সিরিয়াল দিয়ে তাঁর সফল পদচারণা শুরু। অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে নিজেকে নিয়ে যেতে চান অনন্য এক উচ্চতায়। হাসতে হাসতেই বলেন,” পরিশ্রমে আমার কোনো আলসেমি নেই”। কথা বলছিলাম অভিনেত্রী তমা হোসেনের সাথে, তিনি আড্ডা দিয়েছেন আমাদের সাথে দেশের বার্তার সাথে।  

দেশের বার্তা: এতো ব্যস্ততায়ও আমাদের সময় দিয়েছেন, আপনাকে ধন্যবাদ। কেমন আছেন আপনি ?  

তমা হোসেন: আলহামদুলিল্লাহ্‌ , ভীষণ ভালো আছি।

দেশের বার্তা: অভিনয় জীবনের শুরুটা কীভাবে?

তমা হোসেন: অভিনয়ে আসাটা একদম ভালোলাগা থেকে। যদিও প্রথমে আমার আবৃত্তি শেখার খুব ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু থিয়েটারের সাথে যুক্ত হয়ে যাই, সেখান থেকেই আসলে শেখা শুরু। অভিনয় আমার মঞ্চ দিয়েই শুরু।

দেশের বার্তা:মঞ্চ ও পর্দায় সমানতালে অভিনয় করে যাচ্ছেন, কোন মাধ্যমে নিজেকে ফুটিয়ে তুলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

তমা হোসেন: প্রথমত আমি মোটেও সমান তালে দুই সেক্টরেই অভিনয় করে যাচ্ছিনা। মঞ্চেই আমি বেশি কাজ করছি, মঞ্চে আমি সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কারণ এখানে সবকিছু লাইভ, ভুলও লাইভ, সাফল্যও লাইভ। তবে পর্দায় কাজ করলে চরিত্রকে অনেক সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করার সুযোগ থাকে। দুটোই প্রিয়, কিন্তু মঞ্চটা একটু বেশি কাছের মনে হয়।

দেশের বার্তা: সর্বশেষ কাজের ব্যাপারে যদি দর্শকদের জানাতেন?

তমা হোসেন: সর্বশেষ কাজটা আমার মঞ্চেই ছিলো। আমার জন্য প্রত্যেকবারই অনেক চ্যালেঞ্জিং লাগে। আমি প্রাঙ্গণেমোর থিয়েটারের শিক্ষার্থী। শেষ কাজ মঞ্চেই করেছি, রবীন্দ্রনাথ এর “শেষের কবিতা” এবং উৎপল দত্তের বিখ্যাত নাটক “টিনের তলোয়ার” নাটকে।

দেশের বার্তা: অভিনয়ের ক্ষেত্রে কোন ধরনের চরিত্র আপনাকে মুগ্ধ করে?

তমা হোসেন: যে চরিত্রগুলোর ভেতরে অনেক লেয়ার থাকে, মানসিক দ্বন্দ্ব থাকে—সেগুলো আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে। একদম সাদাকালো চরিত্রের চেয়ে ধূসর চরিত্রগুলো করতে বেশি ভালো লাগে। যেটা আমি না, তেমন চরিত্র করতে বেশি ভালো লাগে।

দেশের বার্তা: আপনি খুব বেছে বেছে কাজ করেন। এর পেছনে আপনার সাবলীল যুক্তি কী?

তমা হোসেন: আমি মনে করি, সব কাজ করা জরুরি না। কিছু কাজ ছেড়ে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। আমি এমন কাজ করতে চাই যেটা আমাকে গ্রো করতে সাহায্য করবে, শুধু উপস্থিত থাকার জন্য কাজ করতে চাই না।

দেশের বার্তা: মিডিয়ায় কাজ করতে গিয়ে পরিবারের সমর্থনে ইতিবাচকতা বা নেতিবাচকতা আপনার কাজে কেমন প্রভাব ফেলে?

তমা হোসেন: পরিবারের সমর্থন অনেক বড় শক্তি। তারা পাশে থাকলে কাজের প্রতি আত্মবিশ্বাস বাড়ে। তবে কোনো নেতিবাচকতা থাকলেও সেটা আমাকে থামাতে পারে না, বরং নিজেকে প্রমাণ করার ইচ্ছে বাড়িয়ে দেয়।

দেশের বার্তা: কাজের ব্যস্ততায় পরিবারকে কীভাবে সময় দেন?

তমা হোসেন: আমি একদমই খুব ব্যস্ত থাকিনা, যেহেতু খুব কাজ করিনা। আর কাজে থাকলেও কাজের মাঝেই চেষ্টা করি সময় বের করতে। কিন্তু যখন সময় দিই, তখন পুরোটা দিয়েই দিই।

দেশের বার্তা: বন্ধুদের সঙ্গে কী আড্ডা হয়?

তমা হোসেন: আমার বন্ধুসংখ্যা একদমই কম। বন্ধুদের সাথে একদম সাধারণ আড্ডা—নাটক, জীবন, হাসি-ঠাট্টা সবকিছু নিয়েই। এই সময়গুলোই আমাকে রিফ্রেশ করে যতক্ষণ ওই লিমিটেড বন্ধুদের সাথে থাকি।

দেশের বার্তা: ছেলেবেলার কোনো বন্ধুদের সাথে কী যোগাযোগ হয়?

তমা হোসেন: হ্যাঁ, কয়েকজনের সাথে এখনো যোগাযোগ আছে। সময় বদলালেও এই সম্পর্ক কখনই বদলাবে না। সেজন্যই ছোটবেলার বন্ধুরা এখনো আছে।

দেশের বার্তা: আপনি খুব সুন্দর লিখেন। ভবিষ্যতে এই লেখাগুলোকে নিয়ে কী কোনো পরিকল্পনা আছে?

তমা হোসেন: মোটেও আমি ভালো লিখিনা। কিন্তু ভালো লেখা আমার ভালো লাগে, মাঝে মাঝে শেয়ার করি সেটাই ফেসবুক পাতায়।

দেশের বার্তা: অনেকেই আছেন যারা প্রধান চরিত্রকেন্দ্রীক অভিনয়ে অভ্যস্ত। আপনার কাছে কী গল্প আগে নাকি প্রধান চরিত্র প্রভাবিত করে?

তমা হোসেন: আমার কাছে গল্পটাই আগে। ভালো গল্প থাকলে ছোটো চরিত্রও অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি ভালো একজন পরিচালকও সাধারণ কিছু দিয়ে খুব ভালো কিছু তৈরি করার শক্তি রাখেন।

দেশের বার্তা: এমন কোনো চরিত্র কী আছে, যেটাতে নিজেকে ধারণ করে উঠতে পারেননি আজও?

তমা হোসেন: আমি অভিনয়ের জগতে একদমই নতুন। প্রত্যেক চরিত্র করার পরই মনে হয়েছে আরও ভালো করা যেতো। এই অসম্পূর্ণতাই আমাকে এগিয়ে যেতে হয়তো সাহায্য করবে।

দেশের বার্তা: মঞ্চের সঙ্গে টেলিভিশনের পার্থক্য কতোখানি?

তমা হোসেন: মঞ্চ আর টেলিভিশন একদম ভিন্ন মাধ্যম। মঞ্চে একটানা পারফরম্যান্স, আর টিভিতে শট বাই শট কাজ। দুটোতেই আলাদা ধরনের প্রস্তুতি লাগে।

দেশের বার্তা: ভালো অভিনয়ের জন্য মঞ্চের ভূমিকা ঠিক কতোটুকু?

তমা হোসেন: মঞ্চ একজন অভিনেতার ভিত্তি তৈরি করে। এখানে ডিসিপ্লিন, ভয়েস, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সবকিছু শেখা যায়। অভিনয়ে ভালো করতে মঞ্চের ভূমিকা সত্যিই অনবদ্য।

দেশের বার্তা: মঞ্চের অভিজ্ঞতা বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া যারা অভিনয় করছেন, সেই বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যা কী?

তমা হোসেন: অভিনয় শেখার আসলে কোনো নির্দিষ্ট পথ নেই। তবে মঞ্চ বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকলে ভিত্তিটা মজবুত হয়। না থাকলেও শেখার ইচ্ছা আর ডেডিকেশন থাকলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

দেশের বার্তা: নিজের করা চরিত্রগুলোর মধ্যে কোন চরিত্র আপনাকে মুগ্ধ করেছে?

তমা হোসেন: প্রতিটা চরিত্রই কিছু না কিছু শিখিয়েছে। কিন্তু অভিনয়ে আমি অনেক কাঁচা, অনেক অনেক শেখার বাকি, অতএব নিজের অভিনয় আমাকে কখনই মুগ্ধ করেনি।

দেশের বার্তা: আপনি অনবদ্য অভিনেতা মোশাররফ করিমের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। মোশাররফ করিমের সঙ্গে আপনার কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?

তমা হোসেন: ভাইয়ার সঙ্গে কাজ করা দারুণ অভিজ্ঞতা। উনি খুবই ডেডিকেটেড এবং কো-অ্যাক্টরদের জন্য খুব কমফোর্টেবল একটা পরিবেশ তৈরি করেন। ওনার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে।

দেশের বার্তা: আপনি কী অভিনয়ের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখবেন? নাকি কোনো পরিকল্পনা আছে?

তমা হোসেন: আপাতত অভিনয়ই আমার মূল জায়গা।

দেশের বার্তা: আপনি নিজেকে ভবিষ্যতে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান?

তমা হোসেন: নিজেকে একজন পরিপূর্ণ অভিনেতা হিসেবে দেখতে চাই যেনো কাজ দিয়ে মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারি।

দেশের বার্তা: কখনো কী এমন হয়েছে যে, কাজ শেষে মনে হয়েছে, আরও ভালো করা যেতো?

তমা হোসেন: প্রতিবার। প্রতিটা কাজের পরই মনে হয়, আরেকটু ভালো করা যেতো। এমনকি একটা দুইটা কাজ আমাকে কাঁদিয়েছে যে এতো পঁচা অভিনয় করলাম? তার মানে আমি পঁচা শিক্ষার্থী।

দেশের বার্তা: অভিনয় করতে গিয়ে কী আপনার মনে হয়েছে, আপনি আপনার সামগ্রিক দায়বদ্ধতা সর্বদা বজায় রাখতে পারেন না অথবা সুযোগ পান না?

তমা হোসেন: কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো সবটা দেওয়া যায় না, সময়, পরিস্থিতি বা সীমাবদ্ধতার কারণে। তবে চেষ্টা সবসময় থাকে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার।

দেশের বার্তা: আপনার কাছে ভিউয়ের গুরুত্ব কতোটুকু? ভিউ দিয়ে কী সফল অভিনেতা বিবেচনা করা যায়? আপনার কাছে আসলে ভিউ ও ভিউয়ারের বিষয়টি স্পষ্ট করে জানতে চাই। আপনার কি মনে হয়, কোয়ান্টিটি কোয়ালিটিকে নিয়ন্ত্রণ করে?

তমা হোসেন: ভিউ অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ এটা একটা কাজ কতোজন মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে তার একটা ধারণা দেয়। কিন্তু আমার কাছে শুধু ভিউ দিয়েই একজন অভিনেতার সফলতা মাপা ঠিক না। অনেক সময় দেখা যায়, খুব ভালো কাজও কম মানুষের কাছে পৌঁছায়, আবার অনেক সময় কম মানের কাজও বেশি ভিউ পায়, এটা নির্ভর করে ট্রেন্ড, প্রচারণা, আর দর্শকদের রুচির ওপর।

দেশের বার্তা: আপনি বিড়াল খুব পছন্দ করেন কিন্তু এত ব্যস্ততার মাঝেও কীভাবে সময় দেন?

তমা হোসেন: হ্যা, শুধু বিড়াল না, কুকুর বিড়াল, পাখি আমার ভীষণ পছন্দ। কিন্তু পালা হয় পাখি আর বিড়াল। আমার কাছে আসলে ওদেরকে সময় দেয়াটা কোনো দায়িত্বের মতো না, বরং মানসিক শান্তির একটা জায়গা। তাই সময় দেওয়া নিয়ে আলাদা করে ভাবতে হয় না, নিজের থেকেই হয়ে যায়। এটা সময়ের বিষয়ই না, মনোযোগ আর ভালোবাসার বিষয়।

দেশের বার্তা: শেষ প্রশ্নের একটা কথা জানতে চাই অভিনয়ে নিয়মিত হতে নাকি অভিনয় জানা সত্ত্বেও আত্মসম্মানবোধ বিসর্জন দিতে হয়। এখানে আমাদের পাঠকদের জন্য যদি বিষয়টি স্পষ্ট করেন তাহলে নতুনদের জন্য অনুপ্রেরণামূলক একটা আলোর ইঙ্গিত দিতে পারে।

তমা হোসেন: অভিনয়ে নিয়মিত হতে আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে হয় আমি এটা মানি না। হ্যাঁ, এই পথে অনেক কষ্টে থাকতে হয়, ধৈর্য রাখতে হয় এবং অনেক কিছু সহ্য করতে হয়। কিন্তু নিজের সম্মান আর মূল্যবোধ ধরে রেখেই এগোনো সবচেয়ে জরুরি। সত্যিকারের ট্যালেন্ট আর পরিশ্রম থাকলে, দেরি হতে পারে কিন্তু নিজের জায়গা ঠিকই তৈরি হয়।

দেশের বার্তা: আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন ।

তমা হোসেন: মোস্ট ওয়েলকাম, আপনিও ভালো থাকবেন।